default-image

পিপলু খান ছবি বানিয়েছেন। ছবির প্রযোজক সিআরআই। ছবির নাম হাসিনা: আ ডটার’স টেল। প্রেক্ষাগৃহে ছবিটা দেখে আমার প্রতিক্রিয়া হলো, এটা আমাদের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আরেকটা মূল্যবান মাইলফলক হয়ে থাকবে। যেমন আমি সব সময় বলে আসছি, মুক্তির গান আমার প্রিয়তম চলচ্চিত্রের একটা। তারেক মাসুদ লিয়ার লেভিনের ফুটেজ থেকে সম্পাদনা ও খানিকটা শুট করে এই মহামূল্য ছবিটা বানিয়েছিলেন। তাঁর কাছেও ঘণ্টার পর ঘণ্টার ফুটেজ ছিল। গ্রহণের চেয়ে বর্জন করতে হয়েছিল তাঁকে বেশি।

পিপলু খান বলেছেন, তিনি ১০ ঘণ্টার ছবিও বানাতে পারতেন। তা না করে তিনি বানিয়েছেন ৭০ মিনিটের ছবি। এখানে কাজ করেছে তাঁর পরিমিতিবোধ।

দ্বিতীয় যে শঙ্কাটা ছিল, কিন্তু তিনি তা থেকে বেরিয়ে এসেছেন, তা হলো, এই ছবিটা খুব দুঃখের ছবি হতে পারত, এই ছবিটা খুব রাজনীতির ছবি হতে পারত, এই ছবিটা খুব রক্তাক্ত ছবি হতে পারত—তা হয়নি। ছবিটা হয়েছে মানবিকতার ছবি, সম্পর্কের ছবি, পারিবারিক বন্ধনের ছবি এবং পুরো ছবিটার মধ্যে একটা আলোর আভা, একটা ইতিবাচকতা ছিল। সেই আলোর আভাটুকু নিয়ে আমরা সিনেমা হল থেকে বেরিয়ে আসি।

বিজ্ঞাপন

ধরা যাক, একদিন সকালবেলা যদি আমি শুনি আমার বাবা নেই, মা নেই, ভাই নেই, ভাবি নেই, ছোট ভাই নেই, চাচা নেই, ফুফাতো ভাই নেই, কেউ নেই; যে বাড়িটা ছিল প্রাণের প্রাচুর্যে জমজমাট, সেখানে আর কেউ নেই—আমার কী হবে। ৩২ নম্বর বাড়িতে ফিরে এলেন কন্যা দুজন, শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা—এখানে শেখ কামাল সেতার বাজাতেন, ছোট্ট রাসেল সাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়াত, জামাল-কামালের বিয়ের আলপনা রয়ে গেছে মেঝেতে, মেহেদি রয়ে গেছে সুলতানা কামাল কিংবা রোজী—দুই ভাবির হাতে। কবুতর ছাড়াও অনেক পোষা পশুপাখি ছিল। লোকজন গমগম করত। ছিলেন বাংলাদেশের সবচেয়ে রূপবান পুরুষ, বাঙালির জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান এবং মমতাময়ী চিরদুখিনী সর্বংসহা বেগম মুজিব ওরফে রেনু। পুরো বাড়িটা পড়ে আছে; রিক্ত নিঃস্ব, রক্তাক্ত, গুলিবিদ্ধ; গুলিবিদ্ধ পড়ে আছে কবি নজরুলের ছবি...কল্পনা করা যায়! কল্পনাও করা যায় না। যেমন কল্পনা করা যায় না ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ভয়াবহতা।

এসব কিছুর কথা বলেছেন দুই বোন—শেখ হাসিনা আর শেখ রেহানা। সব প্রসঙ্গই আছে। কিন্তু পিপলু খানের মুনশিয়ানা হলো, ছবিটা কেবল দুঃখের ছবি হয়নি, রক্তপাতের ছবি হয়নি; হয়েছে আশার ছবি, আলোর ছবি।

আর টুঙ্গিপাড়া তথা গ্রামবাংলার বর্ষা, নদী, বৃষ্টি, সবুজ খুব ভালোভাবে ফুটে উঠেছে ছবিতে।

বিজ্ঞাপন

বড় মানুষদের নিয়ে, ক্ষমতাবানদের নিয়ে ছবি করা, গল্প লেখা, উপন্যাস লেখা, শিল্প করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তাঁরা বলতে পারেন, এটা ঠিক হয়নি, ওটা আরও বেশি চাই। ওকে আরেকটু বেশি দেখাও।

আমার নিজের অভিজ্ঞতায় তা কখনো হয়নি। আমি যখন যারা ভোর এনেছিল, উষার দুয়ারে, আলো-আঁধারের যাত্রী লিখতে শুরু করি, আনিসুজ্জামান স্যারকে জিজ্ঞেস করি, ‘স্যার, ভয়ে লিখব নাকি নির্ভয়ে লিখব?’ স্যার বলেন, ‘নির্ভয়ে লিখবে।’ আমি নির্ভয়ে লিখছি।

এবং আমাকে বলা হয়েছে, বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা আমাকে বলেছেন, ‘আপনি তো ফিকশন লিখছেন, কোনো অসুবিধা নাই, একটা-দুটো তথ্য এদিক-ওদিক হতেই পারে। লিখুন। আপনি লেখা থামাবেন না।’ আমি উৎসাহ পেয়েছি, সমর্থন পেয়েছি, দোয়া পেয়েছি।

পিপলু বলেছেন, তিনি যখন টুঙ্গিপাড়া যান, তিনি আমার বই দুটো নিয়ে গিয়েছিলেন, নৌকায় পড়তে পড়তে গেছেন, এবং কল্পনা করেছেন, এই পথে যুবক শেখ মুজিব ফিরতেন। ফিরে এসে তাঁর সদ্যোজাত কন্যাকে কোলে তুলে নিলেন, যাঁর নাম রাখা হলো হাসিনা।

বিজ্ঞাপন

পিপলুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, পিপলু, দুই বোনের গল্প, নাম কেন একজনের হলো।

পিপলু একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন, আমার মনঃপূত হয়েছে—দুই বোনের কথা, শেখ হাসিনা আর শেখ রেহানা, জাতির জনকের দুই কন্যার ভাষ্য আমরা শুনি এই ছবিতে; কিন্তু শেখ রেহানাও আসলে তাঁর বড় বোনের সংগ্রাম, নিঃসঙ্গতা, বেদনা আর প্রতিজ্ঞার কথাই বলেন।

সিআরআইয়ের প্রযোজনায় পিপলু যা করেছেন, তা আমাদের মহামূল্যবান দলিল এবং শিল্পকর্ম। মানবিকতার আলো যার উদ্ভাস।

তবে আমার মনে হচ্ছে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ‌‘আমাদের’ ছবি বানানো উচিত। ‘আমাদের।’ আর আমার নিজের মনের মধ্যে একটা স্ক্রিপ্ট তৈরি হতে শুরু করেছে, যারা ভোর এনেছিল, উষার দুয়ারে এবং আলো-আঁধারের যাত্রী, [পরবর্তীকালে এই পথে আলো জ্বেলে, এখানে থেমো না] লেখার অভিজ্ঞতা থেকে—ছবিটার নাম হবে রেনু

পিপলু খানও এই ছবিটা উৎসর্গ করেছেন রেনুকে। প্রেক্ষাগৃহে আমার পাশে বসা ইংরেজি উপন্যাসের লেখক, আমার ‘আইওয়া কর্মশালার বন্ধু’ চন্দ্রহাস চৌধুরীকে আমি বললাম, ‘রেনু হলেন বেগম মুজিব’, তখন আরেক পাশে বসা একটা শিশু বলে উঠল, ‌‘ও...’। অনেক কর্তব্য বাকি, অনেক করণীয় আছে, ওই শিশুটির দীর্ঘ ‘ও’ থেকে আমরা তা বুঝে উঠতে পারি।

হাসিনা: আ ডটার’স টেল ছবিটির বহুল প্রচার কাম্য।

আনিসুলহকপ্রথমআলোরসহযোগীসম্পাদকওসাহিত্যিক

মন্তব্য পড়ুন 0