default-image

কেবল লৈঙ্গিক ভিন্নতার কারণে আপনার-আমার অবহেলা ও বৈষম্যপূর্ণ আচরণের শিকার হয়ে যাঁদের রাস্তাঘাটে হাত পাততে হয়, আমরা তাঁদের হিজড়া বলে চিনি। এই মহামারির মধ্যে কেমন আছেন তাঁরা? কীভাবে দিন কাটছে তাঁদের? আমার–আপনার সাহায্যের টাকায় যাঁরা ‘দিন আনি দিন খাই’ ভিত্তিতে চলেন, গত দুটি সপ্তাহ কীভাবে তাঁদের পেট চলেছে?

হিজড়াদের ঐতিহ্য চাঁদা তোলা। নববিবাহিত দম্পতি অথবা সদ্যোজাত শিশুর বাড়িতে গিয়ে আশীর্বাদের সূত্রে তাঁরা অর্থ চান। এ ছাড়া তাঁরা বাজারে গিয়ে দোকান থেকে নগদ অর্থসাহায্য প্রার্থনা করে থাকেন। অনেক সময় এ নিয়ে ব্যবসায়ী বা গৃহস্থের সঙ্গে তাঁদের বাদানুবাদও হয়।

তবে এসব এখন সম্পূর্ণ বন্ধ। হিজড়াদের একটি বড় অংশ যৌনবৃত্তিতে সম্পৃক্ত। লকডাউনের কারণে উপার্জনের সে রাস্তাও বন্ধ।

হিজড়াদের অপর একটি অংশ, যাদের কোতি বলা হয়ে থাকে, তারা সাধারণত হিজড়াদের ঐতিহ্যগত পেশায় অংশ না নিয়ে জীবনযুদ্ধে এগিয়ে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাঁদের মধ্যে অনেকেই নিজেদের পরিবার থেকে পরিত্যাজ্য, পরিবারের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ নেই। ব্যক্তিগত পর্যায়ে তাঁরা টিউশনি করেন অথবা নাচগান করেন অথবা যৌন ব্যবসার মাধ্যমে তাঁদের জীবন ও জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। তাঁরা যেহেতু হিজড়াদের মতো চাঁদাকেন্দ্রিক পেশায় নিয়োজিত নন, তাঁরা যেহেতু রূপান্তরকামী, তাঁদের নাজুকতা আরও বেশি।

আমার পিএইচডির কাজ বাংলাদেশের হিজড়াদের নিয়ে। সে সুবাদে বিভিন্ন পরিসরে বছর দুয়েক মাঠপর্যায়ে আমার হিজড়াদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে মেশার সুযোগ হয়েছে।

মাঠকর্মের অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি, দেশের অনেক হিজড়া যেমন তাঁদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন আবার তাঁদের অনেকেই নিজ পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। যে অর্থ দিয়ে তাঁরা মা–বাবার দেখাশোনা করেন, ভাইবোনের পড়ালেখার জোগান দিয়ে থাকেন। তাই করোনার এই ক্রান্তিকালে তাঁরা বা তাঁদের পরিবার কীভাবে জীবন যাপন করছে, তার খোঁজ নেওয়া দরকার। যেহেতু তাঁরা কোনো নির্দিষ্ট এলাকাভিত্তিকভাবে এই কাজ করেন না, সেহেতু তাঁরা নানা ধরনের, নানা পেশার মানুষের সংস্পর্শে আসেন।

মাঠকর্মে দেখেছি, হিজড়ারা তাঁদের খদ্দের তালিকায় সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেন প্রবাসী বাংলাদেশিদের। বিদেশে বসবাসরত প্রবাসীদের সঙ্গে তাঁরা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে অনলাইন প্রণয় এবং অফলাইনে মানসিক ও শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়। অনেক হিজড়া আছেন, যাঁরা পেশাগত কারণে নিয়মিত ভারত ভ্রমণ করেন। যেহেতু ভারতে বাংলাদেশের তুলনায় ধর্মীয় দৃষ্টিকোণে হিজড়াদের গুরুত্বপূর্ণভাবে মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে, সেহেতু বাংলাদেশের অনেক হিজড়াই বিভিন্ন পূজা–পার্বণে ভিসা ও পাসপোর্ট ছাড়া ভিন্ন ভিন্ন সীমানা–বন্দর অতিক্রম করে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ভারতে পাড়ি জমান। আবার একটি নির্দিষ্ট সময় শেষে দেশে ফিরে আসেন। ফলে করোনা মহামারিকালে তাঁরা যে কম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন, সেটি বিবেচনা করার অবকাশ নেই।

মনে রাখা ভালো, আপনি হিজড়াদের অস্পৃশ্য ভেবে দূরত্ব বজায় রেখে চলেন বলে করোনাভাইরাস তাঁদের আক্রমণ করবে না, তা যেমন নয়; আবার তাঁরা আক্রান্ত হলে আপনি যে খুব নিরাপদ থাকবেন, সেটিও ভাবার কোনো কারণ নেই। সাধারণ হাঁচি, কাশি বা ছোঁয়ার মাধ্যমে যদি করোনাভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে, তাহলে সেটি খুব স্বাভাবিকভাবেই অনুমেয় যে যৌন সম্পর্কের মাধ্যমেও ভাইরাস সংক্রমিত হতে পারে। অনেক হিজড়া যেহেতু বিভিন্ন দেশ থেকে আসা প্রবাসীদের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হয়ে থাকেন, আবার অনেকেই যেহেতু অপরাপর মানুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হয়ে থাকেন, তাই এই মুহূর্তে তাঁদের সচেতন করা এবং তাঁদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করা খুব বেশি জরুরি।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের জরিপমতে বাংলাদেশে হিজড়ার সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। যদিও হিজড়াদের দাবি, তাঁদের সংখ্যা দেড় লাখেরও বেশি। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ সরকার, প্রথম হিজড়াদের রাষ্ট্রীয়ভাবে নারী-পুরুষভিন্ন পৃথক লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। বলে রাখা ভালো, স্বীকৃতি প্রদান করা আর হিজড়াদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার মধ্যে এবং বাস্তবায়নের মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে করোনা ক্রান্তিকালে হিজড়াদের জীবনযাপন নিয়ে এখন পর্যন্ত সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি, না হয়েছে তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের জন্য সরকারের তরফ থেকে কোনো ধরনের সাহায্য। তাহলে প্রশ্ন হলো, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় হিজড়াদের জন্য কী করছে?

টুকরো টুকরো ফেসবুকে বিচ্ছিন্ন খবরে দেখেছি, কয়েকজন হিজড়া সমাজের দুস্থ, গৃহহীন মানুষের পাশে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে এগিয়ে এসেছে। এই কতিপয় হিজড়া বা হিজড়া সংগঠনের ত্রাণ বিতরণ কর্মসূচি দেখে আমরা যদি ভেবে থাকি, বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা বা উপজেলা পর্যায়ের অথবা গ্রাম অঞ্চলের সব হিজড়া খুব ভালো আছেন, সেটি ভুল হবে।

দুদিন আগে আমি যখন একজন হিজড়া বন্ধুকে ফোন করে জিজ্ঞাসা করলাম তাঁরা কেমন আছেন, তিনি উত্তর দিলেন, ‘অনেক খারাপ পরিস্থিতিতে আছি। কোনো এনজিও বা কোনো সরকারি জায়গা থেকে সাহায্য–সহযোগিতা পাচ্ছি না। কী করব, কেমনে বাঁচব, কিছুই বুঝতেছি না।’

অন্য একজন বললেন, ‘দুইটা পয়সাও নাই, আমরা তো দিন আনি দিন খাই। কামে না গেলে টাকা পামু কেমনে? গত দুই দিন ধইরা আমার বাসায় কেবলমাত্র ভাতের মধ্যে পানি মিশায় খাইতেছি। এইভাবে চলতে থাকলে গলায় দড়ি দিতে হবে। এমনিতেই আমাদের জন্ম নেওয়া তো পাপ, এত দিন বেঁচে ছিলাম, এ–ই বেশি।’

সীমিত পরিসরে বিচ্ছিন্নভাবে হিজড়াদের মাঝে কিছু ত্রাণ যে বিতরণ হয়নি, তা–ও নয়। আমার জানামতে কেবল বরগুনা ও বগুড়ার শিবচর উপজেলায় সেখানকার সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে হিজড়াদের মাঝে কিছু ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিচ্ছিন্নভাবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে হিজড়াদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করা হবে কেন? কেন সমাজকল্যাণ বা দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে হিজড়াদের তালিকা প্রণয়ন করে, জেলা-উপজেলা ও গ্রাম অঞ্চলের সব পর্যায়ের হিজড়াদের প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী সরবরাহের ব্যবস্থা করা হবে না?

রেজওয়ানা করিম: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির পিএইচডি ফেলো

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0