default-image

৭ নভেম্বর দেশের রাজনীতির এক দিকবদলের দিন। অভ্যুত্থান, পাল্টা–অভ্যুত্থান, বিপ্লব-প্রতিবিপ্লব, অবিশ্বাস আর হত্যাকাণ্ডের নানা ঘটনা দিয়ে ৭ নভেম্বরকে চিত্রায়িত করা হয়। এর পাশাপাশি দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতি এরপর থেকে অতীতের বিপরীত দিকে যাত্রা শুরু করেছিল। সমাজতন্ত্রঘেঁষা কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত শাসন ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বদলে উদার গণতান্ত্রিক এবং পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে যাত্রা শুরু হয়। রাজনীতিতে বহু দলের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায়।

৭ নভেম্বরের আলোচিত দুই চরিত্র সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও জাসদের কর্নেল তাহের। জিয়াউর রহমান ও জাসদের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে নানা বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা আছে। জিয়াউর রহমানকে যখন গৃহবন্দী করা হয়, তখন তিনি ছিলেন একা। আর কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে জাসদ সংঘবদ্ধ। ৭ নভেম্বরের শেষ বেলায় জিয়াউর রহমানের পেছনে সামরিক বাহিনী ও জনসাধারণ। কর্নেল তাহেরের জাসদ তখন দিশেহারা। ইতিহাসের এক নির্মম বাস্তবতা।

ইতিহাস তার নিজের পথেই চলে। ৭ নভেম্বর জিয়া ও জাসদ উভয়েই ক্ষমতার দ্বারপ্রান্তে এসে উপনীত হয় এবং একপর্যায়ে সবকিছুই জিয়াউর রহমানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ধাপে ধাপে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল গঠন করেন। চাপের মুখে জাসদ ক্রমেই রাজনীতির মঞ্চ থেকে হারিয়ে যেতে থাকে।

প্রশ্ন হচ্ছে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে কী ধরনের পরিবর্তন এনেছেন বা জাসদ ক্ষমতায় এলে কী ধরনের নতুনত্ব আনতে পারত? বিরোধিতা করলেও আওয়ামী লীগ বা বাকশালধারার বাইরে বেরিয়ে জাসদ নতুন কিছু শুরু করতে পারত কি না?

বিজ্ঞাপন
জিয়াউর রহমান যদি ৭ নভেম্বরের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে না আসতেন বা নিহত হতেন তবে কী হতো? হয়তো জাসদ ক্ষমতা দখল করত। সে ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কী হতে পারত দেশের? এ বিষয়ও বিবেচনায় রাখতে হবে।

৭ নভেম্বরের পর জিয়াউর রহমান রাজনীতিতে এসে দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিকে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন। প্রথমত, দেশে নতুন ধরনের রাজনৈতিক চেতনার সূচনা হয়ে। দেশে রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারা প্রবর্তিত হয়। তারই ধারাবাহিকতায় জাতিগত ও রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদের সংঘাত আমরা লক্ষ করি। জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদকে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ হিসেবে প্রয়োগ করেছিলেন। এটা ভালো কি মন্দ, তা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক আছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে জাতীয়তাবাদী চেতনার ক্ষেত্রে নতুন ধারা নিয়ে আসা জিয়াউর রহমান জনগণের মধ্যে সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়েছিলেন।

সমাজতন্ত্রঘেঁষা একদলীয় কাঠামোর পরিবর্তে জিয়াউর রহমান অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক কাঠামো দাঁড় করিয়েছিলেন। ওই সময় আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে নিবন্ধন দেওয়া হয়। এ কারণে বাকশালে বিলুপ্ত হওয়া আওয়ামী লীগ আবার নিজ পরিচয়ে রাজনীতিতে ফিরে আসে। এর সঙ্গে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামীকেও রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া হয়। সংবিধানে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম সংযুক্ত করা হয়। সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে খাল খনন কর্মসূচি, বয়স্ক ও গণশিক্ষা কর্মসূচি, পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি, গ্রাম সরকার, আনসার ভিডিপিসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কের প্রায়োগিক দিক স্থাপিত হয়। কৃষি ও কৃষককে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ১৯৭৮ সালে সারা দেশে ২৭টি জেলায় ৮১টি খাদ্যগুদাম স্থাপন করা হয় কৃষি ও কৃষকের সুবিধার জন্য, ফসলের ন্যায্য মূল্য প্রদানের জন্য।

৭ নভেম্বরের আগে বাকশাল, জাসদ, সিপিবি, ন্যাপসহ সব রাজনৈতিক দলের অর্থনৈতিক কর্মসূচি ছিল অনেকটাই সমাজতান্ত্রিক ধ্যানধারণার আদলে। এই দলগুলো কেন্দ্রীভূত অর্থনৈতিক কাঠামোকে প্রাধান্য দিয়েছিল। জিয়াউর রহমান এই ধারণার বিপরীতে বাজারমুখী প্রাতিষ্ঠানিক পুঁজির বিকাশকে উৎসাহিত করেছিলেন। জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন না। সামরিক বাহিনীর সদস্য জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে অর্থনীতির দুয়ার খুলে দিলেন। বাকশালের কেন্দ্রীভূত জাতীয়কৃত অর্থনীতির বিপরীতে জিয়াউর রহমানের আমলে বেসরকারি খাতকে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়। বাংলাদেশ এখনো ওই নীতিতেই পরিচালিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক নীতির ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের প্রবর্তিত নীতি ও পদ্ধতি থেকে পরবর্তী সরকারগুলো আর সরে আসেনি।

জিয়াউর রহমান যদি ৭ নভেম্বরের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে না আসতেন বা নিহত হতেন তবে কী হতো? হয়তো জাসদ ক্ষমতা দখল করত। সে ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কী হতে পারত দেশের? এ বিষয়ও বিবেচনায় রাখতে হবে।

জাসদের ইতিহাস, কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক কর্মসূচি বিশ্লেষণ করলে অনুমান করা যায়, জাসদ ক্ষমতায় এলে একদলীয় শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের সম্ভাবনা ছিল। সেনাবাহিনী বিলুপ্ত করে একটি গণবাহিনী প্রবর্তন করার প্রস্তাব বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার দাবিতেই ছিল। রাজনৈতিক সংঘাত বিস্তারের শঙ্কা ছিল। জাসদের বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী হত্যার অভিযোগ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে রয়েছে। জাসদও প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের নেতাদের হত্যা করেছে। এসব কারণে জাসদ ক্ষমতায় এলে বড় ধরনের সংঘাতের শঙ্কা ছিল।

জাসদ মূলত বিপ্লবী চেতনা দিয়ে ওই সময়ে তরুণদের আকৃষ্ট করেছিল। কিন্তু সেনাবাহিনী ও ছাত্রসমাজের ক্ষুদ্র অংশ বাদে জাসদের রাজনৈতিক ভিত্তি খুব বেশি শক্তিশালী ছিল না। আকর্ষণীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচি ছিল জাসদের। কিন্তু এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের মতো নেতৃত্ব ও জনবল জাসদের ছিল না। জাসদীয় সমাজতন্ত্রের স্পষ্ট রূপরেখাও তখন দেখা যায়নি।

তাই ৩ নভেম্বর খালেদ মোশারফের অভ্যুত্থানের বিপরীতে পাল্টা–অভ্যুত্থান করতে গিয়ে জিয়ার দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া জাসদের কোনো বিকল্পও ছিল না। বরং জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে জাসদ বিপ্লব করতে গিয়ে হযবরল অবস্থার সৃষ্টি করেছিল। এ কারণে স্বাভাবিকভাবেই জিয়াউর রহমান নিজের ক্ষমতাকে সংহত করেন। তবে ওই সময় জাসদের সঙ্গে সম্পৃক্ত অনেকেই মনে করেন, জাসদ একাই জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করেনি। ওই সময় যাঁরা জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করে রেখেছিলেন, তাঁরা জিয়াউর রহমানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিলেন। জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর বড় একটি অংশের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। এসব কারণেই জিয়াউর রহমানের প্রাণনাশের শঙ্কা ছিল কম। খালেদ মোশাররফ বা জাসদের পক্ষে সেনাবাহিনীর এই বড় অংশকে এড়িয়ে জিয়াউর রহমানকে হত্যা করা বা চাপ দেওয়া সম্ভব ছিল না।

নিজের জনপ্রিয়তা ও পরিস্থিতি সম্পর্কে জিয়াউর রহমানের সম্যক ধারণা ছিল নিশ্চয়ই। তাই তিনি সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ নেন এবং দেশ শাসন শুরু করেন। দেশ শাসনে জিয়াউর রহমান বিতর্কের ঊর্ধ্ব ছিলেন না। তাঁর সময়ে কর্নেল তাহেরসহ সামরিক বাহিনীর অনেক সদস্যের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। দমন-নিপীড়নের মুখে পড়েন জাসদের নেতা-কর্মীরা।

তবে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও রেষারেষিকে এক পাশে রেখে দেশকে অনিশ্চয়তা ও বিশৃঙ্খল অবস্থা থেকে বের করে নিয়ে আসেন। প্রতিপক্ষের বিষয়ে কঠোর হলেও প্রজাহিতৈষী শাসক হিসেবে তিনি সফল ও জনপ্রিয় ছিলেন। মূলত, জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বেই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দেশে নতুন এক যুগের সূচনা হয়েছিল। ৭ নভেম্বর জিয়াউর রহমানকে সেই সুযোগ করে দিয়েছিল। জিয়াউর রহমান পূর্ণমাত্রায় এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছিলেন। এটাই হচ্ছে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বরের সরাসরি প্রভাব।

ড. মারুফ মল্লিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0