বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আজ যে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স দেখি, সেটার মূল উদ্যোক্তা কিন্তু বঙ্গবন্ধু। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে তিনি মেডিকেল কলেজে শিক্ষার্থীর আসনসংখ্যা দ্বিগুণ করেছিলেন। অর্থাৎ প্রতিবছর দ্বিগুণসংখ্যক চিকিৎসক তৈরি হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। এ ছাড়া সে বছরই তিনি পিজি হাসপাতালের পাশের মুসলিম লীগের পরিত্যক্ত ভবনটি (ব্লক-বি) আইপিজিএমআরকে দেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পিজি হাসপাতালকে ৩০০ থেকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করেন।

কিন্তু বঙ্গবন্ধু বুঝেছিলেন, কেবল ভৌত অবকাঠামোর উন্নতি করেই একটি দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নতি করা সম্ভব নয়। সেদিনের অনুষ্ঠানে তিনি চিকিৎসক ও হাসপাতালের কর্মচারীদের প্রতি মানসিকতার পরিবর্তনের আহ্বান জানান। তিনি চিকিৎসকদের উদ্দেশে বলেন, চিকিৎসকেরা সমাজে বিশেষভাবে সম্মানিত। কিন্তু এ সম্মানের মর্যাদা রক্ষা করা চিকিৎসকদেরই কর্তব্য। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু উল্লেখ করেন, কোনো কোনো চিকিৎসক ব্যক্তিগত ক্লিনিকে গিয়ে রোগীরা ‘ফিস’ প্রদান না করলে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় না বলে তিনি অভিযোগ শুনেছেন।

স্বাধীনতাসংগ্রামে চিকিৎসকসমাজের মহান অবদানের কথা উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু রুগ্‌ণ মানবতার কল্যাণে গ্রাম-গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার জন্য চিকিৎসকসমাজের প্রতি আহ্বান জানান। যে চিকিৎসকেরা গ্রামে যেতে অনীহা প্রকাশ করেছেন, তাঁদের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু বলেন, যাঁরা কেবল নিজেদের স্বার্থ ও সম্মানের জন্য লালায়িত, তিনি সেসব উন্নাসিকের সঙ্গে নেই। তিনি বলেন, ‘যে লক্ষ কোটি মানুষের দুর্দশা ও ত্যাগের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা লাভ করিয়াছি, আজ যদি আমরা তাহাদের দুঃখ-দুর্দশা মোচনে আগাইয়া না যাই, তাহা হইলে তাহারা আমাদের অভিসম্পাৎ দিবে।’ পরের দিন (৯ অক্টোবর ১৯৭২) দৈনিক ইত্তেফাক–এর এক প্রতিবেদনে বঙ্গবন্ধুর এমন বক্তব্য উঠে আসে। সেখানে আরও লেখা হয়,
‘বঙ্গবন্ধু বলেন—
১. চিকিৎসকদিগকে অবশ্যই মানবতার প্রতি সেবার আদর্শ মনে রাখিয়া কাজ করিতে হইবে;
২. চিকিৎসাক্ষেত্রে যাহারা নিয়োজিত রহিয়াছেন, তাহারা ডাক্তার, নার্স, ওয়ার্ড বয় অথবা ঝাড়ুদারই হউক না কেন, তাহাদের প্রধান দায়িত্ব হইল রুগ্ন ব্যক্তির চিকিৎসা ও তাহার কষ্ট মোচন করা;
৩. হাসপাতালে কার্মরত প্রত্যেককেই যথার্থ সম্মান ও মর্যাদা দিতে হইবে;
৪. যে সমস্ত বাঙ্গালী চিকিৎসক আজ অর্থোপার্জনের আশায় বিদেশে রহিয়াছেন, তাঁহাদের উচিত স্বদেশে ফিরিয়া আসা। কারণ এই মনোভাব গুরুতর পাপ;
৫. দেশ গঠনের জন্য প্রত্যেককে সচেষ্ট হইতে হবে;
৬. উন্নত চরিত্র ছাড়া কোনো জাতি বড় হইতে পারে না। সমাজকে দুর্নীতির রাহুগ্রাস হইতে মুক্ত করার জন্য চরম ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে বাধ্য হইতে পারে;
৭. জনগণের প্রতি আমার ভালোবাসাকে দুর্বলতা মনে করিলে ভুল করা হইবে;
৮. যদি প্রত্যেকেই নিজেদের মানসিকতা পরিবর্তনে যত্নবান হন এবং মানুষকে মানুষ হিসেবে গণ্য করিতে পারেন, তবে দেশের উন্নতি অবশ্যম্ভাবী;
৯. হাসপাতালের উন্নতির জন্য ধনিক শ্রেণিকে মুক্তহস্তে দান করার জন্য অগ্রণী হইতে হবে।’

স্বাধীনতাসংগ্রামে চিকিৎসকসমাজের মহান অবদানের কথা উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু রুগ্‌ণ মানবতার কল্যাণে গ্রাম-গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার জন্য চিকিৎসকসমাজের প্রতি আহ্বান জানান। যে চিকিৎসকেরা গ্রামে যেতে অনীহা প্রকাশ করেছেন, তাঁদের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু বলেন, যাঁরা কেবল নিজেদের স্বার্থ ও সম্মানের জন্য লালায়িত, তিনি সেসব উন্নাসিকের সঙ্গে নেই।

বঙ্গবন্ধুর এই ৯টি উপদেশ আজও প্রাসঙ্গিক। আমি মনে করি, বাংলাদেশের প্রতিটি হাসপাতালের প্রবেশদ্বারে এই কথাগুলো বাঁধিয়ে রাখা উচিত। বঙ্গবন্ধু যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে স্বাস্থ্যসেবা খাত ঢেলে সাজাতে চেয়েছিলেন। রাজকোষ উজাড় করে সমৃদ্ধ করতে চেয়েছিলেন প্রতিটি হাসপাতালকে। থানায় থানায় (যা আজ উপজেলা) স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সময় পেয়েছিলেন অল্প। তাঁর সুযোগ্য কন্যা তাঁর আরাধ্য কাজ সম্পাদন করছেন সফলভাবে। তিনি ইউনিয়নে ইউনিয়নে কমিউনিটি ক্লিনিক করেছেন। দেশের বড় বড় সরকারি হাসপাতালে সর্বাধুনিক চিকিৎসা উপকরণ সরবরাহ করা হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নত বিশ্বের সমমানের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এত কিছুর পরও প্রতিবছর লাখ লাখ রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে বিদেশে যাচ্ছেন। তাঁদের অধিকাংশেরই দেশে চিকিৎসা করা সম্ভব। শুধু রোগীদের আস্থার অভাবের কারণে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে।

প্রায় অর্ধশতক পর এসে আমাদের বঙ্গবন্ধুর কথায় ফিরে যেতে হচ্ছে। গুটিকয়েক চিকিৎসকের নেতিবাচক মানসিকতার জন্য পুরো স্বাস্থ্য খাত প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। তাই তাঁদের মানসিকতা পরিবর্তনে জোর দিতে হবে। আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে মানুষের। তবে গত দুই বছরে বাংলাদেশের চিকিৎসকেরা বেশ সফলভাবে সেটা করতে পেরেছেন বলে আমার মনে হয়। অতিমারির কারণে রোগীরা ইচ্ছা থাকার সত্ত্বেও বিদেশে যেতে পারেননি। তাঁরা দেশে অনেক জটিল রোগের চিকিৎসা নিয়েছেন। এতে সাফল্যের হারও বেশি। কোথাও কোনো অভিযোগের খবরও চোখে পড়েনি। আমি ব্যক্তিগতভাবে দেখেছি, অনেক বিত্তশালী রোগী দেশে চিকিৎসা নিয়ে বিস্মিত হয়েছেন। তাঁরা ভাবতেও পারেননি, বাংলাদেশে এই মানের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। এখন সময় সেই আস্থা ধরে রাখার। এটা সম্ভব হলে কেবল চিকিৎসা খাত সমৃদ্ধ হবে না, সবল হবে দেশের অর্থনীতি।

৮ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুর এই ঐতিহাসিক বক্তব্যকে স্মরণীয় করে রাখতে দিনটিকে জাতীয় চিকিৎসাসেবা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হোক। বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি উপদেশ হোক এ দেশের চিকিৎসকসমাজের পাথেয়।

ডা. এস এম মোস্তফা জামান অধ্যাপক, হৃদ্‌রোগ বিভাগ এবং হল প্রভোস্ট, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। সদস্য, স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যাবিষয়ক উপকমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন