'ওপরওয়ালা'দের সুলুক সন্ধানের ধাঁধা

বিজ্ঞাপন
default-image

দেশের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে অনেকগুলো শব্দ, ধারণা ও প্রত্যয় প্রতিনিয়ত ব্যবহৃত হয়, যা অনেক সময় বাইরের লোকজন সহজে বুঝতে পারে না। ব্রিটিশপূর্ব ও ব্রিটিশ ভারতে প্রশাসনে বহুল ব্যবহৃত অনেক ফারসি শব্দ জেলা ও বিভাগীয় প্রশাসন ও বিচার বিভাগে এখনো প্রচলিত। তেমনই একটি শব্দ ‘খাসকামরা’ কিছুদিন আগে বেশ আলোড়ন তুলেছিল। তেমনি ‘নাজির-নেজারত’ ডেপুটি কমিশনার অফিসের একটি অতি পরিচিত শব্দ।

জেলা প্রশাসনের আরেকটি খুব পরিচিত শব্দ ‘উমেদার’। মজার বিষয় হচ্ছে, এটি ডিসি অফিসের কোনো অনুমোদিত পদ নয়। উমেদাররা জেলা প্রশাসকের নানা দপ্তরে বিনা বেতনে খেটে যাওয়া নিম্ন শ্রেণির কর্মচারী, যাঁরা ভবিষ্যতে চাকরি পাওয়ার আশায় বছরের পর বছর বেগার খাটেন। তাঁরা মূলত বিভিন্ন মক্কেলের উপরিজীবী। তেমনি পুলিশের নানা পর্যায়েও এ রকম কিছু পদ-পদবি বা অবৈতনিক কর্মচারী কাজ করেন। নিয়মিত সদস্যদের অনেককেও বিশেষ পদবি বা পরিচয়ে চেনা যায়। বড় মিয়া, মেজ মিয়া, ছোট মিয়ারা বড় দারোগা, মেজ দারোগা ও ছোট দারোগা হিসেবে পরিচিত ছিলেন বা এখনো আছেন। এঁদের সরকারি পদবি যথাক্রমে পরিদর্শক, উপপরিদর্শক ও সহকারী উপপরিদর্শক।

প্রতিটি পুরোনো জেলায় একটি ‘কোতোয়ালি থানা’ আছে, এটি ব্রিটিশের ধারণ করা মোগল ঐতিহ্য। খোদ ‘থানা’ শব্দটাই ফারসি। রয়েছে ‘মুনশি’, কোনো একজন কনস্টেবল যিনি পড়াশোনা জানেন এবং জনগণকে ডায়েরি বা অভিযোগটা লিখে দেন। আর হাল আমলে সব থানায় একজন ‘ক্যাশিয়ার’ থাকেন, তিনি প্রতি মাসে নানা জায়গা থেকে পাওনা আদায় করেন। একই রকমভাবে জেলখানায়ও হরেক রকমের পদ-পদবি এবং ব্যবহারিক শব্দ আছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে ‘ফালতু’। আমাদের নেতারা যাঁরা ওখানে মেহমান হয়েছেন, তাঁরা এসব ভালো বলতে পারেন। এভাবে বিচার বিভাগে মুন্সিখানা, মুনশি, পেশকার, ঢোল-সহরত করে সমন জারি ইত্যাদি অনেক শব্দ প্রচলিত।

ভূমি প্রশাসনে ফারসি শব্দের ছড়াছড়ি। যেমন খাজনা, কবলা, সাফ-কবলা, পরচা, খতিয়ান, কবুলিয়ত, আমমোক্তারনামা, নামজারি, নাম খারিজ, তসদিক, কানুনগো প্রভৃতি। এমনকি নৌবন্দর ও সমুদ্রবন্দরে এমন বিশেষ কিছু শব্দ আছে, যা অন্যত্র ব্যবহৃত হয় না। যেমন সারেং, সুকানি, খালাসি, টেন্ডল প্রভৃতি। এমনকি সড়ক পরিবহনেও কিছু মজার শব্দ আছে। যেমন আমরা অনেকে ব্যঙ্গ করে অনভিজাত বাসকে বলি ‘মুড়ির টিন’; আবার বাসচালকের সহকারীরা প্রাইভেট কার যত দামি আর অভিজাতই হোক এগুলোকে বলেন ‘প্লাস্টিক’। সাম্প্রতিক কালে একটি নতুন শব্দ প্রশাসনের সব স্তরে সর্বত্র ঢালাওভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সে শব্দটির নানা দিক নিয়ে আজকে কিঞ্চিৎ আলোকপাত করার ইচ্ছা হচ্ছে।

এ বিখ্যাত শব্দটি হচ্ছে ‘ওপরওয়ালা’। ওপরের মর্জি, ওপরের নির্দেশ, ওপরের ইশারা প্রভৃতি নানাভাবে অজুহাতের একটি মোক্ষম অস্ত্র বা সত্যিকারের অপকর্ম রোধের বা অসহায়ত্ব বোঝাতে এ ‘ওপর’ বিষয় বা শব্দটির ব্যবহার বারবার ঘুরেফিরে আসে। বড় কোনো অঘটন না হওয়া পর্যন্ত এর মাজেজা খুব একটা বোঝা যায় না। সম্প্রতি ধৃত ও রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে জর্জরিত সাহেদ-সাবরিনা-আরিফুলের ঘটনা ও রটনার নেপথ্য নায়ক-নায়িকা হিসেবে ‘ওপরওয়ালা’ প্রসঙ্গ ঘুরেফিরে আসা সত্ত্বেও ‘ভাশুরের নাম’ মুখে আনতে নেই, এমন ভাব।

এলাকায় তাণ্ডব চালায় কোনো এক ছিঁচকে মাস্তান। পুলিশকে বললে তারা বলে, ওপরের আশীর্বাদপুষ্ট। কিছু করার উপায় নেই। খাসজমি, পুকুর, জলাভূমি জবরদখল হলো, ইউএনও এবং ডিসি সাহেবদের বললে প্রথম বলবেন, কই, কেউ তো অভিযোগ করেনি! অভিযোগ করলে বলবেন, ‘ওপরে’ বলেন। তাঁদের কিছু করার নেই। ওপরের সমর্থন আছে। অধিদপ্তর মন্ত্রণালয়ে বললেও তাঁরা ‘ওপর’ অথবা ‘উপরি’ নির্দেশ করেন। ইউনিয়ন ও উপজেলার কোনো নিয়ম-অনিয়মের প্রসঙ্গ এলে তাঁরা ধানাইপানাই করে যে ‘ওপর’-এর ইশারা করেন, তার হদিস কষ্টে উদ্ধার করা যায়, তবে কতটুকু নির্ভুল তা গবেষণাসাপেক্ষ।

এ ওপরটা যতটুকু বোঝা গেল এলাকার ‘মাননীয় জাতীয় সংসদ সদস্য’ (এমপি)। কিন্তু ডিসি, এসপি, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, এমনকি মন্ত্রণালয় যে ‘ওপর’ দেখিয়ে দেয়, সেটা কোন ‘ওপর’, কত ‘ওপর’? আবার তাঁরা সবাই স্বীয় বিবেচনায়, স্বহস্তে সই করে যা যা করেন, তার সবকিছুই ‘ওপরের’ নির্দেশে করেন বলে আবেগঘন ঘোষণা দিয়ে থাকেন। এ এক অদ্ভুত ধাঁধা। জানা-অজানা, গোপন-প্রকাশ্য যা কিছু ঘটে, সবখানে ওপরের কেউ দণ্ডায়মান বটে।

সম্প্রতি অবসরে যাওয়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. আবুল কালাম আজাদ মন্ত্রী-সচিবের যৌথ ফটোসেশনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে রিজেন্টের কোভিড পরীক্ষাবিষয়ক চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। সাহেদ ও রিজেন্টের যাবতীয় জালিয়াতি ফাঁস হওয়ার পর তিনি বললেন, এর পেছনে ‘ওপরের’ নির্দেশ ছিল। তা তিনি আবার লিখিতভাবেও জানালেন। তখন ‘ওপর’ থেকেই কৈফিয়ত তলব করা হলো। অবশেষে অব্যাহতি। কিন্তু ‘ওপর’-এর সুলুক মিলল না। ওপর সব সময়ই একরকম অধরা, অদেখা ও অস্পর্শা। ‘ওপর’ কি কোনো অশরীরী আত্মা? আমার সাদাসিধে মত, এটি কঠিন, জড় বা বায়বীয় কোনো পদার্থ নয়, নয় কোনো অশরীরী স্পিরিটও। ‘ওপর’ সমসাময়িক সময়ের বিমূর্ত একটি প্রশাসনিক ধারণা, যা পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি কূট সম্পর্কজাল, যেখানে সবার সরব-নীরব সম্মতি থাকে। আখেরে সবার কিছু না কিছু প্রাপ্তিযোগও আছে।

এখন আমরা যদি আমাদের জাতীয় ওপরওয়ালার সুলুক সন্ধান করি, তাহলে অনেক সমস্যারই সমাধান হয়ে যায়।

*ড. তোফায়েল আহমেদ: স্থানীয় শাসন বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদ।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন