default-image

গেল শতকের চল্লিশের দশকে যখন বেশির ভাগ বাঙালি মুসলমান মুসলিম লীগ বা পাকিস্তানবাদে সমর্পিত ছিলেন, তখন যে গুটিকয়েক তরুণ বামপন্থার রাজনীতিতে দীক্ষা নিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে মোজাফফর আহমদ অন্যতম, তিনি অনুসারীদের কাছে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ এবং সাধারণ মানুষের কাছে কুঁড়েঘরের মোজাফফর নামে পরিচিত ছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী মোজাফফর আহমদ প্রথমে কলেজে এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। কিন্তু বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন তাঁর জীবনধারা অনেকটা বদলে দেয়। ইতিমধ্যে নিষিদ্ধঘোষিত কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মণি সিংহ, খোকা রায় প্রমুখের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ঘটেছে। তিনি আজিমপুরে যে বাসায় থাকতেন, সেখানে তাঁরা নিয়মিত বৈঠক করতেন। ১৯৫৪ সালে মাত্র ৩২ বছর বয়সে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছেড়ে দিয়ে মোজাফফর আহমদ পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হন। ওই পরিষদে তিনি স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব এনেছিলেন, যা তখন ক্ষমতাসীনদের সমর্থন পায়নি। তখন মোজাফফর আহমদ আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে এসেছেন এবং মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) কেন্দ্রীয় নেতা।

১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক আইন জারি করলে মোজাফফর আহমদের ওপর হুলিয়া জারি করা হয়। এরপর তিনি আট বছর আত্মগোপনে থেকে রাজনীতি করেন। ১৯৬৬ সালে সরকার হুলিয়া তুলে নিলে মোজাফফর প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালান। তখনো ন্যাপ ঐক্যবদ্ধ এবং সাংগঠনিকভাবে শক্ত অবস্থানে। ষাটের দশকে যে ব্যাপক সংখ্যায় মেধাবী তরুণ বামপন্থার প্রতি আকৃষ্ট হন, তাতে ন্যাপের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ১৯৬৭ সালে দলটি মতাদর্শগত কারণে বিভক্ত হলে মোজাফফর আহমদ পূর্ব পাকিস্তান ন্যাপের (মস্কোপন্থী) সভাপতি হয়েছিলেন। পাকিস্তানভিত্তিক ন্যাপের সভাপতি হন আবদুল ওয়ালি খান।

১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা কর্মসূচি ঘোষণা করলে মস্কোপন্থী অংশ সমর্থন দেয়। অন্যদিকে ভাসানীর নেতৃত্বাধীন চীনপন্থী গ্রুপ ছয় দফার বিরোধিতা করে। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে রাওয়ালপিন্ডিতে আইয়ুব খান আহূত গোলটেবিল বৈঠকে যে ন্যাপ নেতা জোরালোভাবে বঙ্গবন্ধু উত্থাপিত ছয় দফাভিত্তিক শাসনতান্ত্রিক সমাধানের প্রস্তাব সমর্থন করেছিলেন, তিনি মোজাফফর আহমদ।

ষাটের দশকে মণি সিংহের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টি ও মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বাধীন ন্যাপ যে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করেছে, তা হলো তাদের বাম চিন্তার সঙ্গে জাতীয়তাবাদী ধ্যানধারণার সংশ্লেষণ। এর প্রভাব তৎকালীন আওয়ামী লীগেও পড়েছিল। উনসত্তরে আওয়ামী লীগ গঠনতন্ত্রে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির কথা যুক্ত করে। অন্যদিকে চীনপন্থী বামেরা জাতীয়তাবাদী আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষা করলে জনগণ থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এদের একাংশ একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধেরও বিরোধিতা করে।

মুক্তিযুদ্ধে মোজাফফর আহমদ মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়ন গেরিলা বাহিনী গঠনে উদ্যোগী ভূমিকা রাখেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন আদায়েও সচেষ্ট ছিলেন। একাত্তরের সেপ্টেম্বরে মোজাফফর আহমদ বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে গিয়েছিলেন। আরও অনেক বামপন্থীর মতো তিনিও আশা করেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সব দলের সমন্বয়ে একটি ফ্রন্ট গঠন করে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হবে। কিন্তু সেটি সম্ভব হয়নি। স্বাধীনতার পর তিনি প্রথম মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সব দলকে নিয়ে জাতীয় সরকার গঠনের দাবি জানিয়েছিলেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ দাবি মেনে নেওয়া হলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে পরবর্তীকালে যেসব অঘটন ঘটেছে, তা এড়ানো যেত।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ ও ছাত্র ইউনিয়নও প্রতিবাদী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। জিয়াউর রহমানের আমলে অনুষ্ঠিত ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে মোজাফফর আহমদ সাংসদ নির্বাচিত হন। এ সময় তিনি ‘ধর্ম-কর্ম সমাজতন্ত্র’ নামে যে রাজনৈতিক তত্ত্ব হাজির করেন, তা বামপন্থী মহলে বিতর্ক সৃষ্টি করে। যদিও পরবর্তীকালে জাতীয়তাবাদী শক্তিসহ অনেক দলই প্রকারান্তরে সেই পথই বেছে নিয়েছে। পার্থক্য হলো মোজাফফর আহমদ ধর্ম-কর্মের সঙ্গে সমাজতন্ত্রের কথা বলেছিলেন, এখন যাঁরা রাজনীতির নিয়ন্ত্রক শক্তি, তঁারা ধর্ম-কর্মের কথা বললেও সমাজতন্ত্র কথাটি উচ্চারণ করেন না। জিয়াউর রহমান হত্যার পর ১৯৮১ সালে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মোজাফফর আহমদ ন্যাপ, সিপিবি ও জাতীয় একতা পার্টির পক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।

এরশাদের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে মোজাফফর আহমদ জেল খেটেছেন। ১৫ দলের ঐক্যজোট গঠনে ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৮৬ ও ১৯৯১ সালের নির্বাচনে তাঁর দল প্রতিনিধিত্ব করেছে। কিন্তু সাংগঠনিকভাবে দলকে টিকিয়ে রাখতে না পারা এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি নির্ভরশীল হওয়া তাঁর রাজনৈতিক দুর্বলতা হিসেবেই চিহ্নিত হবে। সহযাত্রীদের অনেকে যখন বারবার দল বদল করে মন্ত্রী-সাংসদ হয়েছেন, তিনি প্রায় নিঃসঙ্গ শেরপা হয়ে ছিলেন। কিন্তু এমন কোনো উত্তরসূরি রেখে যেতে পারেননি, যিনি বা যঁারা দলের পতাকাটি সমুন্নত রাখবেন।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তান ফোরাম নামের একটি পত্রিকায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে মোজাফফর আহমদ বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ যেখানে লড়াই শেষ করবে, সেখান থেকেই বামপন্থীদের লড়াই শুরু হবে। কিন্তু বাস্তবে সেটি হয়নি এবং এ জন্য একা তাঁকে দায়ী করা যাবে না।

মোজাফফর আহমদের রাজনৈতিক জীবন বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তাঁর একটি সিদ্ধান্তের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। বাম-মধ্য-ডান যে পন্থীই হোক না কেন আমাদের রাজনীতিকদের অধিকাংশের প্রবণতা হলো, ‘নগদ যা পাও হাত পেতে নাও।’ প্লট-ফ্ল্যাট-শুল্কমুক্ত গাড়ির পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধা সনদের বিনিময়ে সামান্য আর্থিক সুবিধার জন্য যখন অনেকে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, তখন মোজাফফর আহমদ ২০১৫ সালে সরকারের দেওয়া স্বাধীনতা পদক গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেছিলেন, ‘কিছু পাওয়ার জন্য রাজনীতি বা মুক্তিযুদ্ধ করিনি।’

৯৮ বছর বয়সে মোজাফফর আহমদের প্রয়াণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি অধ্যায়ের অবসান হলো বলা যায়। ওই প্রজন্মের আর কোনো রাজনীতিক বেঁচে নেই। তিনি ও তাঁর সহযাত্রীরা যে রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাস করতেন, সেই আদর্শ তাঁর জীবদ্দশাতেই ক্ষীয়মাণ। এখন সেই ধারা নবরূপ নেবে, না নিঃশেষ হতে থাকবে; সেটি নির্ভর করছে উত্তর প্রজন্মর বামপন্থীদের ভূমিকার ওপর।

সোহরাব হাসান: প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি
sohrabhassan55@gmail.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন