default-image

দক্ষিণ ভারতের ছোট্ট রাজ্য কেরালার আয়তন ৩৮ হাজার ৮৬৩ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা ৩ কোটি ৩৪ লাখ। রাজ্যটি বিশ্বকে ‘উন্নয়নের কেরালা মডেল’ উপহার দিয়েছে। উইকিপিডিয়ার তথ্য মোতাবেক ২০১৮ সালে কেরালার মাথাপিছু জিডিপি ছিল ২ হাজার ৪০০ ডলার, যা ভারতের গড় মাথাপিছু জিডিপি ১ হাজার ৯৮৩ ডলারের চেয়ে সামান্য বেশি। ক্রয়ক্ষমতার সাম্যের (পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটি বা পিপিপি) ভিত্তিতে কেরালার মাথাপিছু জিডিপি ২০১৮ সালে ৯ হাজার ২০০ পিপিপি ডলার। কিন্তু মানব উন্নয়ন সূচকের (হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স—এইচডিআই) স্কোরে কেরালা ভারতের সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে ১৯৯০ সাল থেকেই। সর্বশেষ ২০১৮ সালে কেরালার এইচডিআই সূচক ০.৭৮৪ ভারতের এইচডিআই সূচক ০.৬৪–এর তুলনায় এত বেশি যে সেটাকে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সমপর্যায়ের বলে বিবেচনা করা হয়। শিশুমৃত্যুর হার, মাতৃমৃত্যুর হার, জন্মহার, মৃত্যুহার, মোট প্রজননহার, জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির হার, সব পর্যায়ের শিক্ষিতের হার, মৌল স্বাস্থ্যসেবায় অভিগম্যতা, ভর্তুকি দামে খাদ্য-রেশন ও ফিডিং ব্যবস্থা, চিকিৎসক ও জনসংখ্যার অনুপাত—এ ধরনের সব সামাজিক সূচকেও কেরালা অনেক উন্নত দেশকে ছাড়িয়ে গেছে।

কেরালার জনগণ প্রায় শতভাগ শিক্ষিত এবং প্রায় শতভাগ মৌল স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসুবিধার আওতায় চলে এসেছে। নিম্ন আয়ের মানুষ বিপুল ভর্তুকি দামে রেশনের চাল কিনছে। সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী স্কুল ফিডিংয়ের আওতায় চলে এসেছে। সব প্রবীণ কৃষক মাসিক পেনশন পান। জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতার দিক থেকেও কেরালাই ভারতের পথিকৃৎ। মাথাপিছু জিডিপি কম হলেই যে জনসাধারণের জীবনযাত্রার মান দারিদ্র্যপীড়িত হবে, বিশ শতকের পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের প্রতীচ্যের উন্নয়ন তাত্ত্বিকদের এই ধারণাকে যে দুটো উন্নয়ন মডেল সবার আগে ভ্রান্ত প্রমাণিত করেছিল, তার একটি হলো সমাজতান্ত্রিক কিউবা, অপরটি কেরালা। মাথাপিছু জিডিপি বিভিন্ন দেশের মানবকল্যাণ তুলনার জন্য উপযুক্ত নয়—এই ধারণার ক্ল্যাসিক উদাহরণ কেরালা। মাথাপিছু জিডিপি বেশি না হলেও যে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ন্যায়বিচারভিত্তিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ঈর্ষণীয় জীবনযাপনব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, কেরালার জনগণ তৃতীয় বিশ্বে তার সফলতম নজির সৃষ্টি করেছে। ন্যায়বিচার সমুন্নতকারী প্রবৃদ্ধি (ইক্যুইটেবল গ্রোথ) মডেলের এক অনন্য নজির কেরালা। আয় ও সম্পদের বৈষম্য নিয়ন্ত্রণে রেখে জনগণের মাথাপিছু জিডিপির প্রবৃদ্ধি দ্রুত বাড়িয়ে চলেছে রাজ্যটি। কেরালায় পরমতসহিষ্ণু রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে সিপিএমের নেতৃত্বাধীন বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট ও কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউডিএফ)। নির্বাচনের মাধ্যমে এই দুটো জোট পালাক্রমে ক্ষমতায় এলেও কোনো সরকারই পূর্ববর্তী সরকারের গণমুখী পদক্ষেপগুলো ছুড়ে ফেলে না, নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। কেরালার জনগণ সে জন্য তাদের রাজ্যকে ‘গড’স ওউন কান্ট্রি’ অভিহিত করে সৃষ্টিকর্তাকে কৃতজ্ঞতা জানায়।

১৯৫৬ সালে ত্রাবাঙ্কোর, কোচিন ও মালাবার অঞ্চল নিয়ে কেরালা রাজ্য গঠিত হয়। মালয়ালাম ভাষায় কেরালার অর্থ হলো ‘নারকেলের দেশ’। কেরালা ওই সময় পরিচিত ছিল বিস্তীর্ণ ধানখেতের দেশ, মসলার দেশ, স্থির জলের নদীর দেশ, মন্দিরের দেশ, পশ্চিমঘাট পর্বতমালার দেশ, আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার দেশ আর ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ ভূস্বামী–অধ্যুষিত রাজ্য। ষাট ও সত্তরের দশকে কেরালার আরেকটি বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড নেম ছিল বিএ-এমএ পাস রিকশাওয়ালারা—বেকার সমস্যা ছিল এতই প্রকট। ১৯৫৭ সালে কেরালায় অত্যন্ত প্রগতিশীল কৃষি সংস্কারকে নির্বাচনী ইশতেহারের প্রধান অগ্রাধিকার ঘোষণা করে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট নির্বাচনে জিতে ক্ষমতাসীন হয়। ১৯৫৯ সালে কেরালার সরকার ভারতে প্রথম ভূমি সংস্কার আইন পাস করে, কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার সেটা ভন্ডুল করতে উঠেপড়ে লেগেছিল। জওহরলাল নেহরুর সরকার কেরালার সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে কেন্দ্রীয় শাসন জারি করে, কিন্তু বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট আবার নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় ফিরে আসে। ১৯৬৯ সালে কমিউনিস্ট নেতৃত্বাধীন আরেকটি সরকার ‘লাঙল যার জমি তার’ নীতির ভিত্তিতে ভূমির মালিকানার ব্যাপক পুনর্বণ্টনের লক্ষ্যাভিমুখী কৃষি সংস্কার আইন পাস করে। তার প্রধান পাঁচটি বৈশিষ্ট্য ছিল: ১. কোনো পরিবারকে আট হেক্টরের বেশি জমির মালিকানা রাখতে না দেওয়া, ২. বর্গাচাষি ও মালিক বর্গাদার কৃষকদের তাঁদের চাষকৃত জমির কার্যকর মালিকে পরিণত করা, ৩. মধ্যস্বত্বভোগীদের উৎখাত, ৪. কৃষি জোতের একত্রকরণ এবং ৫. তৃণমূল জনগণের সামাজিক ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারের কৃষি সংস্কারের কর্মসূচিতে সম্পৃক্তকরণের ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ।

কেরালার কৃষি সংস্কারের ওপর বিশ্বখ্যাত গবেষক হেরিং সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্র জনগণের এই সামাজিক ও গণতান্ত্রিক সম্পৃক্তকরণকে কৃষি সংস্কার বাস্তবায়নে রাজনৈতিক শক্তি সমাবেশের প্রধান নির্ধারক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কেরালার ভূমির মালিকানা পুনর্বণ্টন কর্মসূচি থেকে ১৫ লাখ কৃষক পরিবার সরাসরি উপকৃত হয়েছে, যা পরবর্তী সময়ে পশ্চিমবঙ্গে বাস্তবায়িত ভূমি সংস্কার আইনমালা ‘অপারেশন বর্গা’র তুলনায় অনেক কমসংখ্যক। কিন্তু কেরালার কৃষি সংস্কারমালা খেতমজুরদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও ক্ষমতায়নে এবং গ্রামীণ শ্রমজীবী জনগণের সংগঠন জোরদারকরণে অনেক বেশি শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পেরেছে, যার ফলে তৃণমূল গণতন্ত্র ও ‘কল্যাণ অর্থনীতি’ প্রতিষ্ঠায় কেরালা মডেল অনেক বেশি সাফল্য অর্জন করেছে।

২০১০ সালে লন্ডনের খ্যাতিমান প্রকাশনা সংস্থা পিয়ারসন থেকে প্রকাশিত আমার ও নিতাই নাগের রচিত গবেষণা পুস্তক ইকোনমিক ইন্টিগ্রেশন ইন সাউথ এশিয়া: ইস্যুজ অ্যান্ড পাথওয়েজ–এ নিচের পরিবর্তনগুলোকে কেরালা মডেলের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে প্রশংসা করা হয়েছে: ১. কার্যকর ও কম দুর্নীতিপূর্ণ রেশনিং ব্যবস্থা ও ফিডিং প্রোগ্রামের মাধ্যমে ভর্তুকি দামে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর মধ্যে চাল বিতরণ, ২. খেতমজুরদের কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা বিধান এবং নিম্নতম মজুরি আইন বাস্তবায়ন, ৩. অবসরপ্রাপ্ত ও বর্ষীয়ান কৃষিশ্রমিকদের জন্য পেনশন চালু, ৪. দলিত জনগোষ্ঠীর জন্য বর্ধিত সরকারি চাকরি, ৫. বর্গাদারদের ভূমিস্বত্বের নিরাপত্তা জোরদারকরণ এবং জবরদস্তিমূলক উচ্ছেদের আশঙ্কা নিরসন, ৬. গ্রামীণ ভিটেমাটিতে বসবাসরতদের দখলি স্বত্ব প্রদান, ৭. ভূমিহীন পরিবারগুলোকে বসতবাড়ি নির্মাণের জন্য প্লট প্রদান, ৮. কৃষিশ্রমিকদের দৈনিক সর্বোচ্চ কর্মঘণ্টা নির্ধারণ এবং তাঁদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা স্কিম চালু, ৯. গ্রামীণ জনগণের স্বাস্থ্যসুবিধা বৃদ্ধির জন্য সরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতাল নেটওয়ার্কের ব্যাপক সম্প্রসারণ এবং ১০. অনুপস্থিত ভূমিমালিকানা উত্সাদন।

কেরালার জনগণ প্রায় শতভাগ শিক্ষিত ও রাজনৈতিকভাবে প্রবল সচেতন, তারা সংগঠিত হয়ে রাজনীতিবিদ ও আমলাদের সার্বক্ষণিক সজাগ ভূমিকা পালনে বাধ্য করে চলেছে। নির্বাচনে মাঝেমধ্যে বামপন্থীরা হেরে গেলেও জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ ও সার্বক্ষণিক মনিটরিং কয়েকবার নির্বাচনে জয়ী কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ সরকারগুলোকেও সংস্কার কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে বাধ্য করেছে। আরও চমকপ্রদ হলো, মধ্যপ্রাচ্যে উচ্চশিক্ষিত ও দক্ষ মানবপুঁজি রপ্তানির ক্ষেত্রে কেরালা ভারতে চ্যাম্পিয়ন। কেরালার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রবাসীদের ক্রমবর্ধমান রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

শুধু মাথাপিছু জিডিপি দিয়ে উন্নয়ন পরিমাপ এবং বিভিন্ন দেশের জীবনযাত্রার মানের তুলনা করা যে মারাত্মক ভুল—এই সচেতনতা সৃষ্টিতে বিশ শতকের আশির দশকে যে কয়েকজন অর্থনীতিবিদ নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাঁরা সবাই কেরালাকে নজির হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। এ ব্যাপারে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে খ্যাতিমান তিনজন উন্নয়নতাত্ত্বিক ছিলেন পাকিস্তানের মাহবুবুল হক এবং ভারতের অমর্ত্য সেন এবং কে এন রাজ। কেরালার সন্তান কে এন রাজ এই ব্যাপারে মাহবুবুল হক ও অমর্ত্য সেনকে প্রভাবিত করেছিলেন, যদিও মানব উন্নয়ন সূচকের উদ্ভাবক হিসেবে মাহবুবুল হক ও অমর্ত্য সেনকেই মেনে নিয়েছে বিশ্ব। অমর্ত্য সেনের ‘স্বাধীনতাই হলো উন্নয়ন’ (ডেভেলপমেন্ট অ্যাজ ফ্রিডম) তত্ত্বের ক্ল্যাসিক নজির কেরালা। কেরালার কৃষি সংস্কার, শিক্ষাব্যবস্থা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, খাদ্যনিরাপত্তাব্যবস্থা, সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা, তৃণমূল পর্যায়ের জনগণের অংশগ্রহণমূলক সংগঠন ও রাজনৈতিক সচেতনতা, বহুদলীয় গণতন্ত্র এবং প্রগতিশীল ও পরমতসহিষ্ণু রাজনৈতিক সংস্কৃতি অমর্ত্য সেনের বিচারে উন্নয়নের সবচেয়ে অনুকরণীয় মডেল উপহার দিয়েছে বিশ্ববাসীকে। বাংলাদেশের নীতিপ্রণেতারা কি এই স্বীকৃতিকে মর্যাদা দেবেন না?

ড. মইনুল ইসলাম: অর্থনীতিবিদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0