default-image

‘দেশের জন্য সব হারালাম। কী পেলাম।’

দেশে থাকতে এ রকমই খেদোক্তি করেছিলেন কোহিনূর মোয়াজ্জেম হোসেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রহরে শহীদ হন তাঁর স্বামী লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন (১৯৩৩-১৯৭১)। তিনি ছিলেন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সরকার যখন প্রথম এই মামলা দায়ের করে, তখন আসামির তালিকায় বঙ্গবন্ধুর নাম ছিল না। মোয়াজ্জেম হোসেন ছিলেন ১ নম্বর আসামি। পরে বঙ্গবন্ধুকে ১ নম্বর আসামি করা হলে মোয়াজ্জেম হন ২ নম্বর আসামি।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ভারতের সহযোগিতায় পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রের যে অভিযোগ আনা হয়েছিল, সেখানে মূল সামরিক নেতা হিসেবে অভিযুক্ত ছিলেন নৌবাহিনীর কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন। রাজনৈতিক নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মোয়াজ্জেমই সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর একদল তরুণ সদস্যকে নিয়ে সরকারকে উৎখাত করতে সক্রিয় ভূমিকা নেন বলে পাকিস্তানি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়।

কোহিনূর হোসেন এই প্রতিবেদককে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, করাচিতে তাঁর বাসায়ই একাধিকবার বঙ্গবন্ধু গিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কী আলোচনা হতো, তা তিনি জানতেন না। মোয়াজ্জেম সাহেবকে পরে জিজ্ঞেস করলে বলতেন, ‘এসব রাষ্ট্রীয় বিষয়। তোমরা বুঝবে না।’ এরপর মোয়াজ্জেম করাচি থেকে ঢাকায় বদলি হয়ে আসেন। কিছুদিন পর তিনি গ্রেপ্তার হন। বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে সব কাগজপত্র নিয়ে যায় সেনারা। মোয়াজ্জেমকে গ্রেপ্তার করলেও কোথায় নিয়ে গেছে, অনেক দিন পরিবারের কেউ জানতেন না। পরে মামলার কথা প্রকাশ পেলে জানা যায়, তাঁকে ঢাকা সেনানিবাসে বন্দী করে রাখা হয়েছে।

কোহিনুর হোসেনের ভাষ্য: আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে বেরিয়ে এসে মোয়াজ্জেম বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর ৩২ নম্বরের বাসায় কয়েক দফা বৈঠক করেছেন। বঙ্গবন্ধু তাঁকে আওয়ামী লীগে যোগ দিতে বলেছিলেন। কিন্তু তিনি নিজে নতুন দল করলেন। প্রথমে এর নাম রাখলেন লাহোর প্রস্তাব বাস্তবায়ন কমিটি। পরে জাতীয়তাবাদী দল। তিনি মনে করতেন লাহোর প্রস্তাবে এক পাকিস্তানের কথা নেই। ফলে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করতেই হবে।

পাকিস্তানি বাহিনী মোয়াজ্জেমের এই মনোভাব জানত বলেই অভিযানের শুরুতেই তাঁকে হত্যা করে। মোয়াজ্জেম তখন থাকতেন সায়েন্স ল্যাবরেটরির কাছের একটি বাসায়। সেদিনের ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে কোহিনূর বলেন, ‘তিনতলা বাসা। মোয়াজ্জেম নিচের তলায় থাকতেন। রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করতেন। ২৫ মার্চও অনেক নেতা-কর্মী এসেছিলেন। তাঁরা চলে গেলে রাত ১২টার পর থেকে ট্যাংক চলার ও গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়।’

এর পরের ঘটনা বলতে গিয়ে কোহিনূর বেগম আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, ‘জিপ গাড়ি ও বুটের আওয়াজ শুনে জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি অনেক আর্মি অস্ত্র তাক করে আমাদের বাসার সামনে দাঁড়ানো। কমান্ডার মোয়াজ্জেম কোথাও লুকিয়ে ছিলেন। আর আর্মিরা তাঁকে খুঁজছিল। তাঁকে না পেয়ে তারা চেঁচিয়ে বলে, “মিসেস মোয়াজ্জেম কোথায়?” তখন তিনি (মোয়াজ্জেম) বেরিয়ে নিচে গিয়ে বলেন, “আমিই কমান্ডার মোয়াজ্জেম।” ওরা তাঁকে উর্দুতে কয়েকবার বলেছে, “বলো পাকিস্তান জিন্দাবাদ”। তিনি বলেছেন, “না, আমি পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলব না। আমার এক দফা, বাংলাদেশ স্বাধীন চাই।” সঙ্গে সঙ্গে ওরা গুলি করে। গুলিবিদ্ধ হয়েও মোয়াজ্জেম বলেছেন, “বাংলাদেশ স্বাধীন চাই।” দোতলার জানালার পর্দা সরিয়ে দেখি আমার স্বামী গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছেন। এরপর সেনারা তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করতে বেয়নেট দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে। তখন সমস্ত শরীর রক্তাক্ত। দেখলাম তাঁকে চ্যাংদোলা করে ওরা নিয়ে যাচ্ছে। তখনো মাথাটা ঝুলছে। এ দৃশ্য দেখে আমি চিৎকার দিয়ে উঠি।’

বেগম মোয়াজ্জেমের বড় আক্ষেপ, তিনি তাঁর স্বামীর লাশটিও ফিরে পাননি। টিক্কা খান নাকি মোয়াজ্জেমকে হত্যা করে তাঁর লাশ নিয়ে যেতে বলেছিল। স্বাধীনতার পর কোহিনূর অনেক কষ্টে দুই ছেলে ও এক মেয়েকে লেখাপড়া করান। বঙ্গবন্ধু তাঁকে চাকরি দিয়েছিলেন সমাজকল্যাণ বিভাগে। সেই চাকরিই ছিল তাঁর একমাত্র সম্বল।

কোহিনূর মোয়াজ্জেমের পরিবারের কেউ আর এখন দেশে থাকেন না। তাঁর দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে এক ছেলে আয়ারল্যান্ডে থাকেন। এক আইরিশ মেয়েকে বিয়ে করেছেন। মেয়ে লন্ডনে থাকেন, তাঁর সঙ্গেই বেগম মোয়াজ্জেম আছেন। আরেক ছেলে অসুস্থ ছিলেন। সম্প্রতি মারা গেছেন।

বিদেশে যাওয়ার আগে কোহিনূর হোসেন ধানমন্ডির এক নম্বর সড়কে একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন। ছেলেমেয়েরা আগেই চলে গিয়েছিলেন। অনেক বয়স হয়েছে। একা কী করে থাকবেন? এরপর তিনিও লন্ডনে চলে যান। মেয়েই তাঁর দেখাশোনা করেন। বছর তিনেক আগে কোহিনূর হোসেন একবার দেশে এসেছিলেন। তাঁর বড় ভাইয়ের ছেলে ডা. ইকবাল আর্সলানের সঙ্গে ২৫ মার্চ টেলিফোনে কথা হয়। জিজ্ঞেস করি, আপনার ফুফু কেমন আছেন? তিনি বললেন, ‘ফুফু লন্ডনে মেয়ের সঙ্গেই আছেন। আরেক ছেলে থাকে আয়ারল্যান্ডে। মাস ছয়েক আগে তিনি লন্ডনে গেলে ফুফুর সঙ্গে দেখা করেছেন।’

কোহিনূর হোসেন এখন দেশে নেই। কিন্তু যেই দেশের জন্য মোয়াজ্জেম হোসেন জীবন দিয়েছেন, সেই দেশ তো আছে তাঁর অন্তরে।

সোহরাব হাসান: কবি ও সাংবাদিক।

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন