আওয়ামী লীগ

'সুসজ্জিত মিথ্যার' বিপরীতে সোজাসাপটা সত্য

বিজ্ঞাপন

আগস্ট শোকের মাস। এ মাসেই আমরা বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হারিয়েছি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপালিত একদল দুর্বৃত্ত সপরিবার তাঁকে হত্যা করে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে জঙ্গিগোষ্ঠী আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভি রহমানসহ ২২ জনকে হত্যা করে। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাই এই হামলার প্রধান টার্গেট ছিলেন। দুটি হত্যাকাণ্ডেরই বিচার হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার সাত আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। বাকিদেরও ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলায় বিচারিক আদালতের রায় পাওয়া গেছে।

এই শোকের মাসের শুরুতে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের দুটি বিপরীতধর্মী বক্তব্য আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। গত রোববার ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর প্রাঙ্গণে কৃষক লীগের উদ্যোগে স্বেচ্ছায় প্লাজমা-রক্তদান কর্মসূচিতে নিজ বাসভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে তিনি বলেছেন, জাতি যখন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দুর্যোগ মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে সফলতা দেখাচ্ছে, তাতে ঈর্ষান্বিত হয়ে একটি মতলবি মহল সরকার ও জনগণের দুর্ভেদ্য ঐক্যের দুর্গে ফাটল ধরানোর অপচেষ্টা করছে। একই সঙ্গে তিনি বিএনপির আন্দোলনের হুমকিতে আওয়ামী লীগ ভীত নয় বলেও মন্তব্য করেছেন।

মঙ্গলবার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে যুবলীগের আলোচনা সভায় ওবায়দুল কাদের দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রতি শোক দিবস উপলক্ষে চাঁদাবাজি না করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, শোক দিবস করতে বেশি পয়সা লাগে না। নিজেদের মধ্যে চাঁদা তুলে, নিজেদের মধ্যেই শোক দিবসের অনুষ্ঠান করবেন। কারও থেকে চাঁদা চাইবেন না। তাঁর মতে, দলের বাইরে কারও কাছ থেকে চাঁদা নেওয়া অপকর্ম।

অনেক চেষ্টা করে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের দুই বক্তব্যের মর্ম উদ্ধারের চেষ্টা করলাম। একদিকে তিনি বলছেন, সরকারের সাফল্যে একটি মহল ঈর্ষান্বিত, অন্যদিকে দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রতি জাতীয় শোক দিবস সামনে রেখে চাঁদাবাজি না করতে অনুরোধ জানিয়েছেন।

সরকারের সাফল্যে যারা ঈর্ষান্বিত, আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক নিশ্চয়ই তাদের প্রতি শোক দিবসকেন্দ্রিক চাঁদাবাজি সম্পর্কে নসিহত করেননি। করেছেন নিজ দলের নেতা-কর্মীদের। সরকারের সাফল্যে কারা ঈর্ষান্বিত, সেই ইঙ্গিতও তিনি দিয়েছেন। বিএনপির ‘সুসজ্জিত মিথ্যার’ বিরুদ্ধে সবাইকে সজাগ থাকতেও বলেছেন এই নেতা।

বিএনপির সুসজ্জিত মিথ্যার বিপরীতে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক কিছু সোজাসাপটা সত্য তুলে ধরলে দেশবাসী সত্য-মিথ্যার ফারাকটা বুঝতে পারতেন। সাম্প্রতিক কালের সোজাসাপটা সত্যের কিছু উদাহরণ পাওয়া গেল ফরিদপুরে। প্রথম আলোর সাম্প্রতিক কয়েকটি প্রতিবেদনে এই জেলার আওয়ামী লীগ নেতাদের যেসব অপকর্ম প্রকাশিত হয়েছে, তা রহস্য কাহিনিকেও হার মানায়। অতীতে নারায়ণগঞ্জ, ফেনী, লক্ষ্মীপুর প্রভৃতি সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে পরিচিতি পেলেও ফরিদপুর বরাবরই শান্ত শহর ছিল। কীভাবে, কখন ও কার প্রত্যক্ষ মদদে এটি রাতারাতি সন্ত্রাস, চাঁদাবাজির জনপদে পরিণত হলো, তার আংশিক বিবরণ ছাপা হয়েছে প্রথম আলোয়। তা–ও ১৬ মে আওয়ামী লীগ জেলা শাখার সভাপতি সুবল চন্দ্র দাসের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের পর। শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন বরকত ও তাঁর ভাই ইমতিয়াজ হাসান রুবেল এতে নেতৃত্ব দেন। ৭ জুন তাঁদের গ্রেপ্তার হওয়ার পর কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসে।

আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে দুই ভাই স্বীকার করেছেন, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, অন্যের বাড়ি ও জমি দখলসহ নানা অপকর্মের মাধ্যমে দুই হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। এসব কাজে তাঁরা সাবেক মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছেন বলে প্রথম আলোর অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে। মোশাররফ হোসেন জেলা আওয়ামী লীগের এক নম্বর সদস্য এবং কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য। মন্ত্রী থাকাকালে তাঁর দাপটে ফরিদপুরে কেউ টুঁ–শব্দ করতে পারতেন না। তাঁর বিশ্বস্ত শাগরেদ হলেন দুই ভাই। জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতির বাড়িতে হামলার কারণ হলো সাবেক মন্ত্রীর বাড়িতে আয়োজিত মিলাদ মাহফিলে গরহাজির থাকা। এত বড় বেয়াদবি তাঁরা কীভাবে মেনে নেন? হামলার সময় সুবল ও তাঁর স্ত্রী মন্ত্রীর বাড়িতে প্রতিকার চাইতে গিয়েও তাঁর দেখা পাননি।

ফরিদপুরের এই কাণ্ড আরও একটি ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয়। ২০১৫ সালের ৬ আগস্ট হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করছিলেন, ‘ভাজনডাঙ্গার জমিদার সতীশ চন্দ্র গুহ মজুমদারের বাড়ি দখলে নিয়ে পুরোনো ভবন গুঁড়িয়ে দিয়েছেন মন্ত্রিসভার প্রভাবশালী এক মন্ত্রী। সাংবাদিকেরা প্রভাবশালী ওই মন্ত্রীর নাম জানতে চাইলে রানা দাশগুপ্ত বলেন, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।’ ফরিদপুর জেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অলক সেন। ওই সংবাদ সম্মেলনের পর দুর্বৃত্তরা তাঁকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করেন। তিনি দীর্ঘদিন হাসপাতালে ছিলেন।

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের একজন নেতা আলাপ প্রসঙ্গে প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে যে ৩১ জন সাংসদকে মনোনয়ন না দেওয়ার জন্য তঁারা আওয়ামী লীগকে অনুরোধ করেছিলেন, তঁাদের মধ্যে খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নামও ছিল।

গতকাল প্রথম আলোর ফরিদপুর প্রতিনিধি পান্না বালার সঙ্গে আলাপ হয়। তিনি জানান, প্রথম আলোয় খবর প্রকাশের পর সাবেক মন্ত্রীর সহযোগীরা গা ঢাকা দিয়েছেন। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি ফরিদপুর আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতাদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে, যাঁরা এত দিন পালিয়ে ছিলেন। সতীশ চন্দ্র গুহ মজুমদারের বাড়ি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানান, সতীশ চন্দ্রের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে অরুণ গুহ মজুমদার এর মালিক হন। বিএনপির আমলে বিএনপির নেতা-কর্মীরা শত্রু সম্পত্তি দেখিয়ে বাড়িটি দখল করে নিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে আওয়ামী লীগ নেতা ও আইনজীবী সুবল চন্দ্র সাহা সেটি উদ্ধার করেন এবং সাবেক মন্ত্রী মোশাররফ হোসেনের কাছে বিক্রির ব্যবস্থা করেন। অরুণ গুহ বাড়ি বিক্রি করে কত টাকা পেয়েছেন, কখনো পরিষ্কার করে বলেননি। তবে সে সময়ে ফরিদপুরে গুঞ্জন ছিল, তিনি ৪ কোটি টাকায় বাড়িটি বিক্রি করেছেন। এখন এর বাজারমূল্য ১০০ কোটি টাকা।

আওয়ামী লীগ উপদেষ্টা পরিষদের একজন সদস্য ও তাঁর সহযোগীদের কাণ্ড নিয়ে যখন ফরিদপুরে তোলপাড়, তখনই দলের আরেক উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য জয়নাল হাজারীও পত্রিকার খবর হয়েছেন। ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মেজবাহউল হায়দার চৌধুরী, সোনাগাজী পৌরসভার মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম জয়নাল হাজারীর বিরুদ্ধে থানায় জিডি করেছেন। এক দশক পর ফেনীতে এসে ১ আগস্ট মাস্টারপাড়ায় আয়োজিত সমাবেশে জয়নাল হাজারী তাঁদের নাম উল্লেখ করে হুমকি দিয়েছেন বলে দুজনই অভিযোগ করেছেন এবং নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার প্রথম আলোয় খবর বের হয়েছে, তথ্য প্রতিমন্ত্রী মো. মুরাদ হাসানের নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবমাননাকর উক্তি করায় সরিষাবাড়ী পৌরসভার মেয়র রুকুনুজ্জামানের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছে। অভিযুক্ত মেয়রও আওয়ামী লীগ নেতা। প্রতিমন্ত্রীর মামলা ও তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী মেয়রের ফেসবুক স্ট্যাটাস দেখে সোজাসাপটা সত্য কিছুটা আঁচ করা যায়। আবার পটুয়াখালীর কেশবপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দুই নেতার বিরোধের জের ধরে এক নেতার অনুসারীরা গত রোববার যুবলীগের দুই নেতা–কর্মীকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করেছেন।

রিজেন্টের কথিত মালিক সাহেদ করিম কিংবা জেকেজির সাবরিনা-আরিফুলের কিট কেলেঙ্কারির দায় আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এড়ালেও ফরিদপুরের দুই ভাই, তঁাদের মদদদাতা, ফেনীর গডফাদার ও তাঁদের সহযোগীদের অপকর্মের দায় কীভাবে এড়াবেন?

এসব ঘটনায় আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক দলের অবস্থান ব্যাখ্যা করলে দেশবাসী বিএনপির সুসজ্জিত মিথ্যার বিপরীতে প্রকৃত সত্যটি জানতে পারতেন।

সোহরাব হাসান: প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি
sohrabhassan55@gmail.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন