চাঁদ আমাদের বাপের কমন শালা। সেই কারণে মামাবাড়ির আবদার নিয়ে মায়ের কোল থেকে ‘আয় আয় চাঁদ মামা’ বলে চেঁচাতে চেঁচাতে আমরা বড় হই। কিন্তু কংস মামা আর শকুনি মামার মতো চাঁদও কখনো আপন মামা হয় না। এই কারণে চাঁদও ‘ভাগনে! ভাগনে!’ বলে আমাদের বাড়ি আসে না। আমরাও যাই না।

‘আমরাও যাই না’ কথাটার মানে এই না যে চাঁদে যেতে চাই, কিন্তু যেতে পারি না। আসলে ‘যেতে পারি, কিন্তু কেন যাব।'

পড়শি দেশ ভারতের চন্দ্রযান-৩ ‘যাব না কেন, যাব’ বলে যখন গতকাল বুধবার চাঁদে চলে গেল, তখন আমাদের অনেককে হাপিত্যেশ করতে দেখলাম। ভাবটা এমন—‘আহারে, যদি আমরাও পারতাম!’

কিন্তু কিছু ছেলেপেলে ফেসবুকে সরব হয়ে তাদের সব হতাশা উড়িয়ে দিয়েছে। তারা যোগ–বিয়োগ–গুণ–ভাগ করে দেখিয়ে দিয়েছে, চাঁদে যাওয়া কোনো ঘটনা না। এটা আমাদের কাছে ‘ওয়ান-টুর ব্যাপার’। কারণ, আমাদের ট্যাঁকে টাকা আছে। টাকার গরম আছে। তারপরও আমরা চাঁদে যাই না। যাব না। কারণ, চাঁদ আমাদের টানে না।

ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো বলেছে, তাদের চন্দ্রযান-৩-কে চাঁদে নামাতে মোট খরচ হয়েছে ৬১৫ কোটি রুপি। মানে বাংলাদেশি মুদ্রায় ৮১০ কোটি ৮৭ লাখ টাকার কিছু বেশি। এই টাকা আমাদের কাছে কোনো ঘটনা! এটি তো ঢাকা–মাওয়া–ভাঙ্গা মহাসড়ক নির্মাণের মাত্র চার কিলোমিটারের খরচ।

কাগজে দেখেছি, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ককে চার লেনের রাস্তা বানাতে প্রতি ১ কিলোমিটারে ২৫৬ কোটি টাকা খরচ করার প্রস্তাব করেছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর। মানে, এই বিরাট লম্বা রাস্তার মাত্র সাড়ে তিন কিলোমিটার পথ যদি আমরা চার লেন না বানিয়ে আগের মতোই দুই লেনে রাখি, তাহলে যে টাকা বাঁচবে, সেই পরিমাণ টাকা দিয়ে ভারত অলরেডি চাঁদে চলে গেছে।

চাঁদে ধান-পান হয় না, পানি-বিদ্যুৎ নাই, তাই আমরা চাঁদে যাই না। পৃথিবীতে নানা রকম ফসল–টসল হয়, খেতখামারি করা যায়, মাছের চাষ করা যায়। সেই কারণে চাষবাসের বিষয়ে আমাদের আগ্রহ আছে। জাগতিক চাষবাসের কায়দাকানুনের সঙ্গে নাকি মহাজাগতিক ব্যাপার–স্যাপার জড়িত। সে কারণে আমরা চাঁদে না গিয়ে থার্ড পার্টি ধরে মহাকাশে গেছি।

আমাদের উচ্চফলনশীল মশার নগর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন গত এক দশকে শুধু মশা মারতেই খরচ করেছে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা।

আমাদের পর্দা–কাণ্ড, বালিশ–কাণ্ড থেকে শুরু করে, এমএলএম–কাণ্ড, শেয়ারবাজার–কাণ্ড, ব্যাংক–কাণ্ড, বিমা–কাণ্ড —ইত্যাকার কাণ্ডে যে প্রকাণ্ড পরিমাণ টাকা হাতের ময়লা হয়ে ধুলার মতো উড়ে গেছে, তাতে যে কারও মনে হবে ‘মানি ইজ ডাস্ট’।

আমাদের যেহেতু টাকা আছে, সেহেতু আমাদের টাকার গরমও আছে। ফলে যে কাজ আমরা নিজে পারি না, সে কাজ আমরা থার্ড পার্টি দিয়ে আউটসোর্সিং করি।

আরও পড়ুন

চাঁদ নিয়ে আবার প্রতিযোগিতা!

চাঁদে ধান-পান হয় না, পানি-বিদ্যুৎ নাই, তাই আমরা চাঁদে যাই না। পৃথিবীতে নানা রকম ফসল-টসল হয়, খেতখামারি করা যায়, মাছের চাষ করা যায়। সেই কারণে চাষবাসের বিষয়ে আমাদের আগ্রহ আছে।

জাগতিক চাষবাসের কায়দাকানুনের সঙ্গে নাকি মহাজাগতিক ব্যাপার–স্যাপার জড়িত। সে কারণে আমরা চাঁদে না গিয়ে থার্ড পার্টি ধরে মহাকাশে গেছি। সেখানে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে আমরা ২০১৮ সালে বঙ্গবন্ধু–১ স্যাটেলাইট সেট করে দিয়ে এসেছি। তখনকার বাজারে এই কাজে খরচাপাতি পড়েছিল ২ হাজার ৯৬৮ কোটি টাকা। মানে পাঁচ বছর আগেই এতে খরচ করেছি প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা (এই টাকায় ডিপিএস খুললে অ্যাদ্দিনে কত টাকা হতো!)। মানে, এই টাকা দিয়ে ভারত তিনবার চাঁদে যেতে পারে। তা ভারত তিনবার কেন, যতবার মনে চায় ততবার যাক; কিন্তু আমরা চাঁদে যাব না।

আরও পড়ুন

চাঁদের জমির তেজারতি ও ফটিকলালদের সেকাল একাল

চাঁদে পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ নেই। আমাদের এখানেও মাঝেমধ্যে এসব থাকে না। চাঁদের পথঘাট খানাখন্দে ভরা, পাথর-টাথর ছড়ানো–ছিটানো; আমাদের বহু পথঘাটের অবস্থাও তাই। প্রথম আলোয় দেখেছি, গত বছর বন্যার পর থেকে এ পর্যন্ত, মানে এক বছর ধরে সুনামগঞ্জের ৮৪টি সড়কের ১৮০ কিলোমিটার রাস্তার অবস্থা চন্দ্রপৃষ্ঠের মতো এবড়োখেবড়ো হয়ে আছে। চাঁদে বাতাস নেই বলে আওয়াজ করে ডাকলেও পাশের লোক সেই ডাক শুনতে পায় না। আমাদের এখানেও অনেক সময় ভুক্তভোগী চেঁচিয়ে মরলেও কর্তৃপক্ষের কানে সে চ্যাঁচানি পৌঁছায় না।

তার মানে, আমরা একধরনের চাঁদের মধ্যেই আছি। এই কারণেই কোনো এক চন্দ্রাহত মরমী শিল্পী গেয়েছেন, ‘ওরে, লুকে বলে আমার ঘরে নাকি চাঁদ আইসাছে।’
তাহলে আপনারাই বলেন, খালি খালি চাঁদে যাব কেন?

  • সারফুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক
    sarfuddin 2003 @gmail. com