স্বাস্থ্য অধিদপ্তর শনিবার এক বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছে, তারা কোভিড–১৯ পরীক্ষা ও রোগীদের চিকিৎসার বিষয়ে বেসরকারি মালিকানাধীন রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি করেছিল ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্দেশিত হয়ে’। কিন্তু নিজেদের সাফাইমূলক এ বক্তব্য দিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিষ্কৃতি লাভের সুযোগ নেই।

কারণ, প্রথমত, রিজেন্ট হাসপাতালের বৈধ লাইসেন্স নেই, এটা জেনেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তাদের সঙ্গে চুক্তি করেছে। দ্বিতীয়ত, করোনার মতো অতি সংক্রামক রোগের পরীক্ষা ও রোগীদের চিকিৎসার অনুমোদন দেওয়া হলো যে হাসপাতালকে, তারা করোনার নমুনা সংগ্রহ করে সেগুলো আদৌ পরীক্ষা করাচ্ছে কি না, পরীক্ষার ভুয়া সনদ দিচ্ছে কি না, নমুনা প্রদানকারীদের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছে কি না—এসবের কিছুই নজরদারি করেনি। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা রিজেন্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে তাদের লাইসেন্স নবায়ন করার জন্য দুবার তাগিদ দিয়েছিল, কিন্তু তারপরও রিজেন্ট কর্তৃপক্ষ লাইসেন্স নবায়ন করায়নি। অথচ তাদের সঙ্গে চুক্তির শর্তই ছিল যে তারা অবিলম্বে লাইসেন্স নবায়ন করাবে। তাহলে শর্ত ভঙ্গ করার দায়ে কেন রিজেন্টের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা হয়নি? কেন তাদের কর্মকাণ্ড মনিটর না করেই প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ অব্যাহত রাখা হয়েছিল? স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলেছে, রিজেন্ট হাসপাতালের স্বত্বাধিকারী মো. সাহেদ করিমের বিষয়ে অধিদপ্তর ‘আগে অবহিত ছিল না’। কোনো ধারণা ছাড়াই, কোনো খোঁজখবর না নিয়েই এত গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব যে প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে, তাদের কৃত অপরাধের দায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এড়াবে কীভাবে?

জোবেদা খাতুন হেলথ কেয়ার (জেকেজি) নামের অন্য যে বেসরকারি হাসপাতালটিকে করোনা পরীক্ষার অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, তাদের কাজকর্মও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মনিটর করেনি। এই হাসপাতালও করোনা পরীক্ষা না করিয়েই ভুয়া সনদ দিয়ে যে অপরাধ করেছে, তার দায়দায়িত্বও অংশত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওপরে বর্তায়। আর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ’ বৈধ লাইসেন্সহীন রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি করার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে নির্দেশ দিয়েছিল কী যুক্তিতে ও কার স্বার্থে, সে বিষয়ে তদন্ত করে দোষী ব্যক্তিদের শনাক্ত করা ও শাস্তি প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া একান্ত জরুরি।

করোনা মহামারির এ সংকটকালে পুরো জাতি যখন ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন, যখন প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন, যখন দৈনিক গড়ে প্রায় ৪০ জন করে করোনা রোগী মারা যাচ্ছেন, তখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অব্যবস্থাপনা ও দায়িত্ববোধহীনতা যারপরনাই হতাশাব্যঞ্জক। এমন জাতীয় দুর্যোগকালে কিছু মহল অনিয়ম-দুর্নীতির নিষ্ঠুর মচ্ছবে মেতে উঠেছে, যারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেরই অংশ—এমন অভিযোগের বাস্তব বিশ্বাসযোগ্যতা রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দায়িত্ব পালনে আরেক বিরাট ব্যর্থতার নমুনা হলো এই যে দেশের ১৫ হাজারের বেশি বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে প্রায় ১০ হাজারই চলছে অবৈধভাবে। অর্থাৎ সেগুলোর বৈধ লাইসেন্স নেই। আর যে পাঁচ হাজার ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বৈধ লাইসেন্স আছে, তাদের ওপরও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোনো নজরদারি নেই। এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কি কোনো জবাবদিহির দায়বোধ নেই?

স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ১১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমরা চাই, এ কমিটি স্বাস্থ্য খাতের সব অনিয়ম-দুর্নীতি, সেগুলোর নেপথ্যের রাজনৈতিক প্রভাব, অনৈতিক যোগসাজশ ইত্যাদি তদন্ত করে অপরাধীদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করবে এবং সরকার সেসব সুপারিশ বাস্তবায়ন করবে। স্বাস্থ্য খাতের কাজকর্মকে নীতিহীন রাজনৈতিক প্রভাব থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত করতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশন স্বাস্থ্য খাতে কাজ করে এমন ১৪টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কালোতালিকাভুক্ত করেছে, তাদের ও তাদের সঙ্গে যোগসাজশকারী সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা ও বিচারের উদ্যোগ নেওয়া হোক।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0