গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় দাবিদাওয়া আদায় কিংবা কোনো অন্যায্য পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আন্দোলন, বিক্ষোভ বা প্রতিবাদ জানানোর রীতিনীতি থাকতেই হবে। যে সমাজ যত বেশি পরিপক্ব বা অভিজ্ঞ, তারা তত বেশি দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ভিন্নমত প্রকাশ করতে পারে। শান্তিভঙ্গের কারণ সেখানে বিরল। বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে একসময় কারণে-অকারণে হরতাল-ধর্মঘট হয়েছে। পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে জনজীবন জেরবার হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বহু ক্ষেত্রে সংগত ও যথাযথ আন্দোলন করাও নানা সময়ে প্রশাসনিক ও দলীয়ভাবে বাধাগ্রস্ত হতে দেখা গেছে। যৌক্তিক আন্দোলনকে প্রতিহত করে সাজানো আন্দোলনের কিছু গ্লানিময় অভিজ্ঞতাও আমাদের আছে। অনেক ক্ষেত্রে ন্যায্য কর্মসূচির ওপর আইন প্রয়োগকারী সংস্থার শক্তি প্রয়োগ আবার ক্ষমতাসীন দলের মদদপুষ্টরা আন্দোলনের নামে গোষ্ঠীস্বার্থ অব্যাহত রাখার কসরত করেছে। প্রশাসন এসব দেখেও না দেখার ভান করেছে, যা সার্বিকভাবে বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত মুক্তসমাজের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে চলেছে।

তবে এবার সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সংস্থার (বিআরটিসি) বাস চলাচল বন্ধের দাবিতে বেসরকারি পরিবহনমালিক ও শ্রমিকদের সিলেট বিভাগজুড়ে ডাকা ২৪ জুনের বাস ধর্মঘটকে অসংগত বলে চিহ্নিত করেছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। আমরা বিভিন্ন সময় লক্ষ করি, বিভিন্ন সংঘটিত শক্তি সমাজে গণতান্ত্রিক অধিকার অনুশীলনের নামে নৈরাজ্য ডেকে আনে। পরিবহন ধর্মঘট তেমনই একটি বিষয়। সাধারণ নিরীহ মানুষকে জিম্মি করে দাবিদাওয়া আদায় কিংবা পেশিশক্তি প্রদর্শন করে মানুষকে ভয় দেখানোই এর লক্ষ্য। সুনামগঞ্জের নাগরিক সমাজকে ধন্যবাদ। তারা এবার শান্তিপূর্ণ উপায়ে পেশিশক্তি প্রদর্শনকারীদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী জনমত গড়ে তুলতে পেরেছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে আইনজীবী সমাজ যেভাবে মানববন্ধনে অংশ নিয়েছেন, তা একটা ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। নাগরিক সমাজকে অবশ্যই সচেতন ও সংগঠিত থাকতে হবে। সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা শুধুই সরকার ও রাষ্ট্রযন্ত্রের নিরঙ্কুশ দায়িত্ব নয়। এতে উপযুক্ত নাগরিক অংশগ্রহণ অপরিহার্য। এটা সুখকর যে নাগরিকেরা তাঁদের স্বার্থরক্ষায় স্থানীয় প্রশাসনের নির্জীব ভূমিকা দেখে থমকে যাননি। এমনকি সুনামগঞ্জবাসীর স্বার্থের অনুকূলে সংহতি প্রকাশ করেছে সিলেটে বসবাসরত সুনামগঞ্জের বাসিন্দাদের সংগঠন। তারা সিলেটের শহীদ মিনারের সামনে ‘গণ-অনাস্থা প্রাচীর’ তৈরি করেছে।

বাস ধর্মঘটিরা স্পষ্টতই সরকারের জনকল্যাণমুখী সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেছে। এ ধর্মঘট শ্রম আইনের লঙ্ঘন, মানবাধিকারের পরিপন্থী। বিআরটিসির বাস চললে বেসরকারি পরিবহনমালিকদের ব্যবসায়গত স্বার্থহানি ঘটবে, মূলত এ কারণেই তাঁরা বেআইনি ও গণবিরোধী ধর্মঘটে যোগ দিয়েছেন। আমরা মনে করি, ধর্মঘটি মালিক-শ্রমিকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা দরকার। বিশেষ করে তাঁরা পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানের অনুরোধ যেভাবে অগ্রাহ্য করে সরকারি কাজে বাধা তৈরি করেছেন, সেটা কার্যত আইনগত দণ্ডনীয়।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0