default-image

নারীর জীবনমান উন্নয়নে বাংলাদেশের অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো। গত দেড়-দুই দশকে নারীশিক্ষা বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় ছেলে ও মেয়ের সংখ্যা প্রায় সমান। এর ফলে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে না এলেও বাল্যবিবাহের সংখ্যাও অনেক কমে গিয়েছিল। কিন্তু করোনাকালে বাল্যবিবাহের হার বেড়ে যাওয়ার খবরটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ইউনিসেফ প্রকাশিত ‘কোভিড-১৯: শিশুবিবাহ অগ্রগতির জন্য হুমকি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, মহামারিতে বিদ্যালয় বন্ধ থাকা, অর্থনৈতিক চাপ, সেবা বিঘ্নিত হওয়া, গর্ভাবস্থা এবং মা-বাবার মৃত্যুজনিত ঘটনা সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে থাকা মেয়েদের বাল্যবিবাহের ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিয়েছে।

বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি টোমো হোজুমি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের ব্যাপকতা বিশ্বে চতুর্থ সর্বোচ্চ। লাখ লাখ মেয়েশিশুর জীবন কঠিন ও জটিল করে তুলেছে কোভিড-১৯। এর কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বিদ্যালয় বন্ধ থাকা, বন্ধুবান্ধব ও সহায়তা কার্যক্রম থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা এবং ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য। টোমো হোজুমি যথার্থই বলেছেন, ‘আমরা যদি জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ না নিই, তাহলে মেয়েশিশুরা হারাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ।’ শৈশবে যেসব মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়, তারা তাৎক্ষণিক ও জীবনভর এর পরিণতি ভোগ করে। তাদের ঘরোয়া সহিংসতার শিকার হওয়ার আশঙ্কাও বেশি থাকে। বাল্যবিবাহ অল্প বয়সে অপরিকল্পিত গর্ভাবস্থার ঝুঁকি বাড়ায়। অনেক সময় তা মৃত্যুরও কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

কেবল ইউনিসেফের প্রতিবেদন নয়, বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও বাল্যবিবাহের উদ্বেগজনক তথ্য উঠে আসছে। গত ১০ বছরে বিশ্বব্যাপী শিশু হিসেবে বিয়ে হয়ে যাওয়া নারীদের অনুপাত ১৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল। প্রতি চারজনের মধ্যে প্রায় একজন থেকে কমে প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজনে পরিণত হয়েছিল, যা প্রায় আড়াই কোটি শিশুবিবাহ প্রতিরোধের সমতুল্য।

বিজ্ঞাপন

উল্লেখ্য, জাতিসংঘের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে বিশ্বনেতারা ২০৩০ সালের মধ্যে বাল্যবিবাহের অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড গাল৴স সামিটে ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ বছরের নিচের বাল্যবিবাহকে শূন্য করা, ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী নারীর বাল্যবিবাহের হার এক-তৃতীয়াংশে নামিয়ে আনা এবং ২০৪১ সালের মধ্যে বাল্যবিবাহ পুরোপুরি নির্মূল করার অঙ্গীকার করেছেন।

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সরকার নতুন আইন করেছে (যদিও সেই আইনে ফাঁকফোকর আছে)। কিন্তু আমাদের দেশে আইন করা ও এর প্রয়োগের মধ্যে বিস্তর ফারাক। অনেক সময় অভিভাবক ও সমাজের অসচেতনতার কারণে বাল্যবিবাহ হয়ে থাকে। আইন অনুযায়ী, ১৮ বছরের আগে কোনো মেয়ের এবং ২১ বছরের আগে কোনো ছেলের বিয়ে হতে পারবে না। অনেক সময় মা–বাবা মেয়ের নিরাপত্তার কথা ভেবে অল্প বয়সে বিয়ে দেন। কিন্তু তাঁদের বুঝতে হবে বাল্যবিবাহের নামে মেয়েটিকে আরও বেশি নিরাপত্তাহীনতার দিকে ঠেলে দিলেন।

তাই ইউনিসেফ কর্মকর্তার সতর্কবাণী সরকারের নীতিনির্ধারকদের কতটা সজাগ করবে, প্রশাসন কতটা সক্রিয় হবে, তার ওপরই নির্ভর করছে বাল্যবিবাহ কমবে কি না। বাল্যবিবাহ একটি সামাজিক অপরাধ। এ অপরাধ রোধ করতে আইনের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক জাগরণ তৈরি করা প্রয়োজন। আত্মতুষ্টি বিপদ ডেকে আনতে পারে।

সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন