আফগানিস্তানে উভয় সংকটে ওবামা

বিগত দুটি মাস, অর্থাত্ সেপ্টেম্বর আর অক্টোবর ২০০৯-এর বেশির ভাগ সময়ই যুক্তরাষ্ট্রে সুন্দর একটি হেমন্ত কাটিয়ে এলাম। হেমন্তে, বিশেষ করে দেশটির পূর্বকূলের ‘নিউ ইংল্যান্ড’ আর উত্তর ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যে, গাছে গাছে আর পাতায় পাতায় রঙের নয়নাভিরাম বাহার। এই মৌসুমে প্রকৃতির পরিপক্বতা আর পরিপূর্ণতা মন ভরানো। কিন্তু এই হেমন্ত উপভোগ করার অবকাশ বারাক হোসেন ওবামার রয়েছে বলে মনে হয়নি। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ১০ মাসের মধ্যে, বিপুল জনপ্রিয়তা আর প্রত্যাশায় নির্বাচিত ওবামা এখন তাঁর মেয়াদের যুগসন্ধিক্ষণে রয়েছেন। ভার্জিনিয়া আর নিউ হ্যামশায়ার অঙ্গরাজ্যে সদ্য সমাপ্ত গভর্নর নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের বিজয় প্রেসিডেন্ট ওবামার জন্য সেই বার্তাই বহন করে।এদিকে অর্থনৈতিক মন্দার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ওবামার গৃহীত পদক্ষেপের সুফল প্রতীয়মান হওয়ার সময় এখনো আসেনি, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা সংস্কারের বিষয়ে তাঁর ধ্যান-ধারণা এখন জাতীয় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে আর শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায়, তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচারের কাঠগড়ায় তিনি এখন রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁকে বিচারের মানদণ্ডটি যে তাঁর পূর্বসূরিদের তুলনায় স্পর্শকাতর, সেই কথাটি সাবেক প্রেসিডেন্ট কার্টার সরাসরি ভাষায় আর সাবেক প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন প্রচ্ছন্নভাবে ব্যক্ত করেছেন। প্রেসিডেন্ট ওবামার অবস্থান কঠিনতরই করেছে, তাঁর এই বছরের নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রাপ্তি। পুরস্কারটি যতটুকু প্রত্যাশার, ততটুকু অর্জনের নয়।ওয়াশিংটন পোস্ট কাগজটি তার সম্পাদকীয়তে তো বলেছে যে, ‘প্রেসিডেন্ট ওবামা শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন বটে, তবে দোষটা তার নয়।’ পুরস্কারটি গ্রহণে তাঁর সম্মতিদানসূচক বিবৃতিতে, প্রেসিডেন্ট ওমাবা তা ভাগ করতে চাইলেন, ‘সেই তরুণীটির সঙ্গে যে নির্যাতন আর বুলেটের মাঝেও, তাঁর বাক্স্বাধীনতা আদায়ের দাবিতে নীরবে পথ চলেছে।’ এখানে ইঙ্গিতটি ইরানি তরুণী নিদা আগা-সুলতানের প্রতি, যিনি ইরানের সাম্প্রতিক রাষ্ট্রপতি আহমাদিনেজাদের নির্বাচন-উত্তর প্রতিবাদ মিছিলে, পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন। ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকাটির মতে, নোবেল পুরস্কারটি মরণোত্তর নিদা আগা-সুলতানকে প্রদান করলে ওবামা এই বিব্রতকর অবস্থা থেকে পরিত্রাণই পেতেন।রূঢ় বাস্তব তো এই যে প্রেসিডেন্ট ওবামার দায়িত্ব গ্রহণের ১০ মাস পরেও পারমাণবিক চুল্লি নিয়ে ইরানের সঙ্গে বচসার কোনো সমাধান হয়নি, ইরাকে এখনো আগুন জ্বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের শান্তিপ্রক্রিয়া এখনো স্থবির আর পাকিস্তানে তালেবানদের দাপট বেড়েই চলেছে।কিন্তু এই মুহূর্তটিতে প্রেসিডেন্ট ওবামার কঠিনতম চ্যালেঞ্জ হলো আফগানিস্তান। প্রায় দেড় মাস হলো আফগানিস্তানে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী প্রধান, জেনারেল স্ট্যানলি ম্যাকক্রিস্টেল, আফগানিস্তানে আরও ৪০ হাজার মার্কিন সৈন্য প্রেরণের অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি সেই দেশে একটি নতুন স্ট্র্যাটেজির সুপারিশ করেছেন। তা হলো আফগানিস্তানের জনবিরল অঞ্চলগুলো থেকে ন্যাটো (অর্থাত্ মূলত আমেরিকান) সৈন্য প্রত্যাহার করে ঘনবসতি অঞ্চলে তাদের মোতায়েন করা হোক, যাতে সেনাবাহিনী আফগান জনসাধারণের মন জয় করে তাদেরই সম্পৃক্ততায় তালেবানবিরোধী যুদ্ধ পরিচালনা করে। অতীতে প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেনাঘাঁটি স্থাপনের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তজুড়ে তালেবানদের অবাধ গতিবিধি ব্যাহত করা। তা সম্ভব হয়নি এবং গত কয়েক মাসে প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত সেই ঘাঁটিগুলোয় অনেক আমেরিকান সৈন্য প্রাণ হারিয়েছে।আফগানিস্তানে অতিরিক্ত সৈন্য প্রেরণের পক্ষে তার যুক্তি দিয়ে জেনারেল ম্যাকক্রিস্টেল সন্ত্রাসীদের একটি বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁর মতে, আফগানিস্তানে এখন তিনটি প্রধান সন্ত্রাসী গোষ্ঠী রয়েছে। প্রথম হলো মোল্লা ওমরের নেতৃত্বে তালেবানদের ‘কোয়েটা সুরা’। ম্যাকক্রিস্টেলের কথায় এ গোষ্ঠীটি এখন আফগানিস্তানের অনেক প্রদেশেই বিকল্প সরকার স্থাপন করেছে, যা বিভিন্ন ক্ষেত্রে আফগান জনসাধারণের মধ্যে তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। দ্বিতীয় গোষ্ঠীটি হলো, ‘হাক্কানি নেটওয়ার্ক’, যা দক্ষিণ-পূর্ব আফগানিস্তানে সক্রিয় রয়েছে, আর যার সমর্থন জোগাচ্ছে পাকিস্তান আর গালফ প্রণালীর আরব সন্ত্রাসীরা। আল-কায়েদার সঙ্গে এ গোষ্ঠীটির নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। তৃতীয় গোষ্ঠীটি হলো গুলবউদ্দিন হেকমতিয়ারের হেজব-এ-ইসলামি। আফগানিস্তানের তিনটি প্রদেশ এবং পাকিস্তানে রয়েছে গোষ্ঠীটির আধিপত্য এবং ভবিষ্যতে তালেবান প্রশাসনের সহযোগিতায় এ গোষ্ঠীটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এই সন্ত্রাসীরা পাকিস্তান থেকে সাহায্য পাচ্ছে, যেখানে তাদের ঘাঁটি রয়েছে। জেনারেল ম্যাকক্রিস্টেলের মতে, আল-কায়েদা ও অন্যান্য চরমপন্থী গোষ্ঠী পাকিস্তান থেকেই বিদেশি (অর্থাত্ মূলত আরব ও উজবেক) সৈন্য এবং আত্মঘাতী যোদ্ধা প্রেরণ করে ও সন্ত্রাসীদের কারিগরি সহায়তা প্রদান করে থাকে। আদর্শগত দীক্ষা ছাড়াও প্রেষণ আর আর্থিক সাহায্যের ক্ষেত্রে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। জেনারেল ম্যাকক্রিস্টেল এও চাইছেন যে ৪০ হাজার অতিরিক্ত সৈন্য প্রেরণের সঙ্গে সঙ্গে আফগান সেনাবাহিনীর সংখ্যা দুই লাখ ৪০ হাজারে এবং পুলিশের সংখ্যা এক লাখ ৬০ হাজারে উন্নীত করা হোক। তার জন্য প্রয়োজন বিশাল বাজেট এবং এদের যথাযথ প্রেষণের সর্বাত্মক প্রচেষ্টার। এখন প্রেসিডেন্ট ওবামার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা। দেড় মাস যাবত্ তিনি তাঁর উপদেষ্টাদের সঙ্গে অনেক বৈঠকই করেছেন। এদিকে রিপাবলিকানরা চাইছে যে অতিরিক্ত সৈন্য প্রেরণের অনুকূলে সত্বর সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক। সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট চেনি অভিযোগ করেছেন যে প্রেসিডেন্ট ওবামা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন। এদিকে আমেরিকান সৈন্যদের হতাহতের সংখ্যা যতই বাড়ছে, ততই দেশে যুদ্ধবিরোধী অভিমত গড়ে উঠছে। আফগানিস্তান না পরিশেষে ওবামার ভিয়েতনাম হয়ে দাঁড়ায়, এই ভীতি অনেকেরই মনে। এদিকে অতীতে আফগানিস্তান আর পাকিস্তানে ধর্মীয় সন্ত্রাসী সৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। শুধু তাই নয়, তদানীন্তন সোভিয়েত বাহিনীর আফগানিস্তান দখলের সময়ে তালেবানরা তো ছিল মূলত যুক্তরাষ্ট্রেরই সৃষ্টি। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একপেশে ইসরায়েল ঘেঁষা নীতি জনগণের মনে যে হতাশা আর ক্রোধ সৃষ্টি করেছিল, তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ৯/১১ এবং ৯/১১-উত্তর অগণিত হিংসাত্মক কর্মকাণ্ডে আর মুসলিম বিশ্বে ‘মাশরুমের’ (ব্যাঙের ছাতা বলতে চাইছি না) মতো আল-কায়েদা এবং তার সমর্থকদের গজিয়ে ওঠায়। একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব মূলত সেই দেশেরই সরকার আর জনগণের—ভিন দেশের রাষ্ট্রপতির নয়—এই উপলব্ধিটি যে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক মহলের কোনো কোনো অংশে বিরাজ করছে না, তা বলা যায় না। কিন্তু ওবামার আরও একটি সমস্যা হলো, আফগানিস্তানে কোনো বিশ্বাসযোগ্য সরকার সৃষ্টি করা যাচ্ছে না। নির্বাচনের নামে আফগানিস্তানে যে প্রহসন চলল, তার মাঝ থেকে তো কারজাইই আবার প্রেসিডেন্ট হিসেবে অধিষ্ঠিত হলেন। অথচ নির্বাচনের প্রথম রাউন্ডের কারচুপিতে হতাশ হয়ে আফগানিস্তানে নিযুক্ত জাতিসংঘের উপপ্রধান পিটার গলব্রেইথ (যিনি যুক্তরাষ্ট্রেরই নাগরিক) পদত্যাগ না করে পারলেন না। বিগত কারজাই সরকারের দুর্নীতি আর অদক্ষতা নিয়ে কারওই দ্বিমত নেই, অথচ কারজাইয়ের কোনো বিকল্প যুক্তরাষ্ট্ররা সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই সত্যটি আফগানিস্তান সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট ওবামা সিদ্ধান্ত গ্রহণে একটি বিরাট ‘ফ্যাক্টর’ হয়ে রইবে। এদিকে কারজাইয়ের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ কারজাইয়ের নির্বাচনকে অবৈধ বলে আখ্যায়িত করেছেন। প্রেসিডেন্ট ওবামা সত্যিকার অর্থেই এখন উভয় সংকটে রয়েছেন। অতিরিক্ত সৈন্য মোতায়েনের সুপারিশ গ্রহণ না করলে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র আর ন্যাটো সৈন্যদের অবস্থান টিকিয়ে রাখা যাবে না। আর অতিরিক্ত সৈন্য মোতায়েনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভিয়েতনামের মতো যুদ্ধে ফেঁসে যাওয়ার আশঙ্কা। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ওবামা আফগানিস্তানের যুদ্ধকে ‘প্রয়োজনের যুদ্ধ’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। ওবামার মতে, আফগানিস্তানে তালেবানদের বিজয় সেই দেশকে সন্ত্রাসীদের ঘাঁটিতে পরিণত করবে, যেখান থেকে ‘তারা যতভাবে সম্ভব আমাদের ওপর আঘাত হানতে চাইবে।’ তিনি এও মনে করেন, আফগানিস্তানের সঙ্গে ‘তার প্রতিবেশী পাকিস্তানের ভবিষ্যত্ ওতপ্রোতভাবে জড়িত আছে’, যেখানে ‘তালেবান আর আল-কায়েদার লক্ষ্য হলো পারমাণবিক রাষ্ট্রটির ক্ষমতা দখল।’এই অবস্থায় দুর্বল হলেও একটি সান্ত্বনা ওবামা খুঁজে পাবেন। তা হলো পাকিস্তানের অন্তত দৃশ্যত একটি নির্বাচিত সরকার রয়েছে, যদিও কারজাইয়ের তুলনায় জারদারি যে ধোয়া তুলসী পাতা তা বলা যায় না। তবে পাকিস্তানে সেনাবাহিনী তালেবানদের বিরুদ্ধে এখন জোরালো অভিযান চালাচ্ছে। এই অভিযানের প্রতি সেই দেশে জনসমর্থন গড়ে উঠছে। অবশ্য পাকিস্তানে মার্কিনবিরোধী মনোভাব ব্যাপকভাবে বিরাজমান। কিন্তু এই মুহূর্তটিতে তালেবানভীতি তা ছাড়িয়ে গেছে বলে মনে হয়।যুক্তরাষ্ট্র এখন এই দুই দেশে একই যুদ্ধে লিপ্ত। এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন ছিল, দুই দেশেই ক্ষমতাবান সরকারের সহযোগিতার। জারদারি আর কারজাই নিয়ে এখন ওবামার কারবার, আর এই দুর্ভাগ্যের অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রান্ত পররাষ্ট্রনীতিই দায়ী। পাকিস্তানে একের পর এক সামরিক শাসকদের, তার নিজের স্বল্পমেয়াদি স্বার্থে সমর্থন জুগিয়ে, তা সেই দেশে গণতন্ত্রের ভিত্তিকে মজবুত হতে দেয়নি, আর ৯/১১-এর পর আফগানিস্তানকে বাদ দিয়ে ইরাকের ওপর অকারণে ঝাঁপিয়ে পড়ে আফগানিস্তানে তালেবানদের শক্তি সঞ্চয় করার সময় এবং সুযোগ এনে দিয়েছে। আবার অনেকে এও মনে করেন যে যখন তালেবানরা আফগানিস্তানে দুর্বল ছিল, তখনই প্রয়োজন ছিল তাদের সঙ্গে কথাবার্তা চালানোর। এখন যখন তারা আফগানিস্তানে যথেষ্ট শক্তি সঞ্চয় করেছে, দেশটির অনেক অংশে বিজয়ের আস্বাদ লাভ করেছে, তারা কি শান্তি আলোচনায় বসবে?প্রেসিডেন্ট ওবামা আফগানিস্তানে অতিরিক্ত সৈন্য প্রেরণ সম্বন্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে সময় নিচ্ছেন। তবে খুব বেশি সময় তাঁর হাতে নেই এই কারণে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে উঠেছে। নিজের সরকারের নীতিনির্ধারক ছাড়াও তাঁর মিত্র রাষ্ট্রগুলোর সরকারপ্রধানদের সঙ্গে আলোচনা করছেন। প্রেসিডেন্ট ওবামার জন্য এ সিদ্ধান্তটি এতই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে যে তাঁর পদক্ষেপের সাফল্য অথবা ব্যর্থতা তাঁর নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যেক উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবান্বিত করবে।ফারুক চৌধুরী: সাবেক পররাষ্ট্র সচিব। কলাম লেখক।