default-image

প্রথম আলোর ফরিদপুর প্রতিনিধির পাঠানো খবর থেকে জানা যায়, বাংলা ১৪২৫ সনে ফরিদপুর সদর উপজেলার চরমাধবদিয়া ইউনিয়নের আফজাল মণ্ডলের গরুর হাটের একক দরপত্রদাতা হিসেবে জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা শওকত আলী জাহিদ ৫০ হাজার টাকায় ইজারা পান। বাংলা ১৪২৬ ও ১৪২৭ সনে ইজারার মূল্য ছিল যথাক্রমে ৫৩ হাজার ও ৫৫ হাজার টাকা। সেই ইজারা এবার হয়েছে ৯৬ লাখ ১ হাজার ১০০ টাকায়।

এক বছরের ব্যবধানে কোনো গরুর হাটের ইজারা ২৭৪ গুণ বাড়লে তা অবিশ্বাস্যই মনে হবে। আসলে এবার যে দর উঠেছে, সেটাই স্বাভাবিক, অস্বাভাবিক ছিল আগের তিন বছরের ইজারা। সে সময় ফরিদপুরে সবকিছু চলত সাবেক মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের অঙ্গুলিহেলনে। তাঁর এপিএস এ এইচ এম ফোয়াদের পৃষ্ঠপোষকতায় খ্রিষ্টীয় ২০১৮ সালে হাটটির পত্তন হয়। এরপর থেকে হাটটির ইজারা কে পাবেন, কত টাকায় ইজারা হবে, সবকিছু তিনিই ঠিক করে দিতেন। কথায় বলে বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড়। মন্ত্রীর চেয়েও তাঁর এপিএসের দাপট বেশি।

গত বছর ফরিদপুরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে মহাপ্রলয় ঘটে যায়। সাবেক মন্ত্রীর দুই শাগরেদ রুবেল ও বরকত গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে দৃশ্যপট পাল্টে যায়। তাঁদের বিরুদ্ধে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও বিদেশে অর্থ পাচারের মামলা হয়। সাবেক মন্ত্রীর অন্য সহযোগীরাও গা ঢাকা দেন, যাঁর মধ্যে সাবেক এপিএসও আছেন।

বিজ্ঞাপন

সাবেক মন্ত্রীর অনুসারীদের দাপট কমে যাওয়ার পর চলতি বছর হাটটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ইজারার দরপত্র হয় এবং ১৬টি দরপত্র জমা পড়ে। সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে মেসার্স মণ্ডল অ্যান্ড সন্সের মালিক আরশাদ মণ্ডল ইজারা পান ৯৬ লাখ ১ হাজার ১০০ টাকার বিনিময়ে। সাজানো দরপত্র আর স্বাভাবিক দরপত্রের মধ্যে এটাই ফারাক।

সাবেক মন্ত্রীর আশীর্বাদপুষ্ট ফরিদপুর আওয়ামী লীগের সাবেক নেতৃত্ব কেবল হাটের ইজারা নয়, সবকিছুতেই বখরা বসিয়েছেন। তাঁরা সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন অনেক সম্পদ দখল করেছিলেন, যার অধিকাংশ প্রকৃত মালিকদের কাছে ফেরত দেওয়া সম্ভব হয়েছে। তবে সাবেকদের দাপট যে একেবারে নিঃশেষিত হয়নি, তার প্রমাণ গরুর হাট ইজারা দেওয়ার পর সাবেক ইজারাদারের বাধা সৃষ্টি। তিনি রাতারাতি হাটে স্থাপনা বসিয়ে ‘আফজাল মণ্ডল জামে মসজিদ’ নামের একটি ফলক ঝুলিয়েও দিয়েছেন, কলাগাছ লাগিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন সেসব অপসারণ করে নতুন ইজারাদারদের হাটটি বুঝিয়ে দিয়েছে।

৯৬ লাখ টাকার হাট মাত্র ৫০ হাজার টাকায় ইজারা নিয়ে সাবেক মন্ত্রীর শাগরেদেরা রাষ্ট্রের কত ক্ষতি করেছেন, এখন সেই হিসাব নেওয়া প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান চাইলেই রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি নয়ছয় করতে পারে না। যাঁরা তিন বছর ধরে রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে সাজানো ইজারার নামে আত্মসাৎ করেছেন, সরকারের উচিত তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া।

ইজারার নামে রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি করার কাজটি কেবল ফরিদপুরে হয়েছে তা নয়। বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আঁতাতের কারণে অনেক আমানতে খেয়ানতের ঘটনা ঘটে থাকে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান ও বাছাই করলে এ ক্ষেত্রে দুর্নীতি অনেকটা কমানো সম্ভব। মুখে যাঁরা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্লোগান দিচ্ছেন, তাঁরা কাজটি করে দেখাবেন আশা করি। হাটবাজার-ঘাট প্রভৃতি ইজারার নামে সরকারি তহবিল লোপাট বন্ধ হোক।

বিজ্ঞাপন
সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন