গত ১৮ আগস্ট চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ে এক রোহিঙ্গা নারী নিজের নামে জাতীয় পরিচয়পত্র (স্মার্ট এনআইডি) তুলতে গিয়ে ধরা পড়েন। এ ঘটনার সুবাদে জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদানের কার্যক্রমে দুর্নীতি এবং নির্বাচন কমিশনের কম্পিউটার সিস্টেমের সাইবার নিরাপত্তার বিপজ্জনক ভঙ্গুরতার চিত্র উঠে এল। এটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয়।

গণহত্যার মতো পরিস্থিতির শিকার হয়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে এবং নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি এখনো
সেখানে তৈরি হয়নি। এমন বাস্তবতায় শরণার্থীদের কেউ কেউ যেভাবেই হোক, এ দেশের নাগরিক পরিচয় পেতে মরিয়া হয়ে উঠলে অবাক হওয়া কিছু নেই। তাদের সেই ইচ্ছা পূরণের অবৈধ কর্মকাণ্ড ঘিরে নির্বাচন কমিশনে দুর্নীতির চক্র গড়ে উঠছে। চট্টগ্রামে আটক ওই রোহিঙ্গা নারী গ্রেপ্তার হওয়ার পর নির্বাচন কমিশন, পুলিশ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে এসেছে।

নির্বাচন কমিশনের চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানা কার্যালয়ের অফিস সহায়ক পদে কর্মরত জয়নাল আবেদীন নামের এক ব্যক্তিকে গত রোববার রাতে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তাঁর বন্ধুর কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় একটি ল্যাপটপ কম্পিউটার, যেটি ২০১৫ সালে নির্বাচন কমিশনের ওই কার্যালয় থেকে ‘খোয়া’ গিয়েছিল। জয়নাল আবেদীন এই দীর্ঘ সময় ধরে ওই ল্যাপটপ ব্যবহার করেছেন ভুয়া নাগরিক পরিচয়পত্র তৈরির কাজে। এটা করেই তিনি গত কয়েক বছরে এত ধনী হয়েছেন যে তাঁর গ্রামে নির্মীয়মাণ পাঁচতলা একটি বাড়ি এলাকাবাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। অথচ নির্বাচন কমিশনে অফিস সহায়ক পদে তাঁর বেতন তেমন অঙ্কের নয়, যার জোরে অত বড় বাড়ি নির্মাণ করা সম্ভব। তাঁর পৈতৃক ধনসম্পদ নেই, কারণ তাঁরা বাবা ছিলেন মাছ ধরার ট্রলারের শ্রমিক।

জয়নাল আবেদীনের এত অর্থের উৎস নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির কর্মকাণ্ডে তাঁর সুসংগঠিত দুর্নীতি। তিনি একা নন, অর্থের বিনিময়ে ভুয়া এনআইডি তৈরি করে দেওয়ার এই কাজ পরিচালিত হচ্ছে একটি চক্রের দ্বারা। এই চক্রের কোনো কোনো সদস্য নির্বাচন কমিশনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়েও কর্মরত ছিলেন বলে পুলিশের সূত্রে বলা হচ্ছে। ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকায় একেকটি ভুয়া এনআইডি দেওয়া হতো, এমন কথা বলেছেন চট্টগ্রাম কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মহসীন।

জয়নাল ও তাঁর এক ভাই, যিনি নির্বাচন কমিশনের কর্মী নন; রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট তৈরি করে বিদেশে পাঠান বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ। জয়নালের মুঠোফোনে পুলিশ রোহিঙ্গাদের জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার বিষয়ে তথ্য পেয়েছে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জয়নাল স্বীকার করেছেন যে তিনি রোহিঙ্গাদের জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির কাজ করেছেন। আর হারিয়ে যাওয়া ল্যাপটপগুলোর মধ্য থেকে ৫১টি ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়া গেছে, যেগুলো রোহিঙ্গাদের জন্য তৈরি হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, নির্বাচন কমিশনের একাধিক কার্যালয় থেকে পাঁচটি ল্যাপটপ খোয়া গেছে, যেগুলোয় জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির ডেটা এন্ট্রির কাজ করা হতো। এ বিষয়ে কমিশন নিশ্চুপ ছিল। ল্যাপটপগুলোকে এত দিন কমিশনের কম্পিউটার সিস্টেম থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়নি। এতে প্রমাণিত হয়, নির্বাচন কমিশনের কম্পিউটার সিস্টেমের সাইবার সিকিউরিটি অবিশ্বাস্য মাত্রায় ভঙ্গুর।

একটি দেশের নাগরিকত্বের পরিচয়সংবলিত তথ্যভান্ডার সে দেশের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ার দায় নির্বাচন কমিশনকে নিতে হবে। বিষয়টি তদন্ত করে দায়ী কর্মকর্তাদের জবাবদিহি ও শাস্তির পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। জরুরি নির্বাচন কমিশনের সাইবার সিকিউরিটি শক্তিশালী করা।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন