default-image

রিলায়েন্স ফিন্যান্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রশান্ত কুমার হালদার, যিনি পি কে হালদার নামে অধিক পরিচিত, তাঁর বিরুদ্ধে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করার অভিযোগ আছে। তাঁর আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-পরিচিত অনেককে অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকা পাইয়ে দেওয়ার তথ্যও বেরিয়ে আসছে।

সম্প্রতি ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের সাবেক এমডি রাশেদুল হকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলায় তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে যা বলেছেন, তাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের নামও বেরিয়ে এসেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পি কে হালদারের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরীর গভীর সম্পর্ক ছিল এবং তাঁর মাধ্যমেই পি কে হালদার বিভিন্ন অনিয়মকে ‘ম্যানেজ’ করতেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন বিভাগ থেকে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং পরিদর্শন করার জন্য বছরে দুবার সহকারী পরিচালক থেকে যুগ্ম পরিচালক পদের দুজন কর্মকর্তা যেতেন। তখন অনিয়ম করার (অনিয়ম না ধরার জন্য) জন্য তাঁদের প্রতিবার পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা করে ঘুষ দেওয়া হতো। এর বিনিময়ে তাঁরা ইতিবাচক প্রতিবেদন দিতেন। এ ছাড়া প্রতি মাসে দুই লাখ টাকা করে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগের তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক ও বর্তমান নির্বাহী পরিচালক শাহ আলমকে দেওয়া হতো বলেও অভিযোগ আছে। শাহ আলম ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগ দেন এবং ২০১৩ সালে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দেখভালের দায়িত্বে থাকা আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগের মহাব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পান। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে তিনি নির্বাহী পরিচালক হিসেবে পদোন্নতি পান। তাঁর মেয়াদেই দেশের কমপক্ষে ১০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের দুর্নীতি হয়।

বিজ্ঞাপন

এদিকে অর্থ পাচার ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান তদারকি-নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগে গত এক যুগে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বিস্তারিত তথ্য জানতে চেয়েছেন হাইকোর্ট।

যেকোনো দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থাপনা তদারক করার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। সেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা যদি উৎকোচ নিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতিবাজদের সাচ্চা ব্যক্তি বলে সনদ দেন, তাহলে দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনা বলে কিছু থাকে কি? এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে প্রায় ৮১০ কোটি টাকা চুরি হয়ে যায়, যার সিংহভাগ এখনো উদ্ধার করা যায়নি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন দলের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অনেক পুরোনো। বিস্ময়কর যে এত বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির পরও বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত নির্বাহী পরিচালক শাহ আলমকে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে দেওয়া হয়েছে। যে কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মাসওয়ারি উৎকোচ নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ, তাঁর জন্য বিভাগ অদলবদল কি শাস্তি হতে পারে?

অবিলম্বে উৎকোচের অভিযোগ তদন্ত করা হোক। কিন্তু অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পদে রেখে তদন্ত করলে যে তা বিশ্বাসযোগ্য হবে না। একই সঙ্গে দুদকের উচিত বাংলাদেশ ব্যাংকের যে ডেপুটি গভর্নরের সঙ্গে পি কে হালদারের গভীর সম্পর্ক ছিল, সেই এস কে সুরের আর্থিক বিষয়াদিও খতিয়ে দেখা। গভীর সম্পর্কের পেছনে কোনো আর্থিক লেনদেন ছিল কি না, তা জানার অধিকার দেশের করদাতাদের নিশ্চয়ই আছে।

বিজ্ঞাপন
সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন