default-image

গতকাল মঙ্গলবার প্রথম আলোয় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, যার সারকথা ভয়াবহ। সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় গৃহীত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বছরের পর বছর ধরে এমন অনিয়ম চলে আসছে, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী যেটাকে ‘ভয়াবহ’ বলে মন্তব্য করেছেন। সরকারি উন্নয়ন খাতে প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন পদ্ধতি সম্পর্কে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এক পরিপত্রে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, কোনো প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৫০ কোটি টাকা বা তার বেশি হলে সেটি বাস্তবায়নের জন্য একজন পূর্ণকালীন পরিচালক (প্রজেক্ট ডিরেক্টর বা পিডি) নিয়োগ করতে হবে। একই কর্মকর্তাকে একাধিক প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ করা চলবে না। নির্দেশনাটি দেওয়া হয়েছে ২০০৮ সালের এক পরিপত্রে। কিন্তু এরপর দীর্ঘ ১২ বছর ধরে এই নির্দেশনা লঙ্ঘন করে একই কর্মকর্তাকে একাধিক প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এমনকি এমন কর্মকর্তাও আছেন, যিনি একই সঙ্গে ১৪টি প্রকল্পের পরিচালকের দায়িত্ব পেয়েছেন।

এটা কীভাবে সম্ভব? সরকারি কর্মকর্তারা তো নিজেরা প্রকল্প পরিচালক হতে পারেন না; তাঁদের এই পদে নিয়োগ করা হয়। এই দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর; তারাই পিডি নিয়োগ করে। কিন্তু একই কর্মকর্তাকে একাধিক প্রকল্পের পিডি হিসেবে নিয়োগ করা হলে যে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের তথা খোদ সরকারের নির্দেশনাই লঙ্ঘন করা হয়, তা কি মন্ত্রণালয়গুলোর জানা নেই? এটা অসম্ভব যে মন্ত্রণালয়গুলোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিয়মটি জানেন না। তাহলে বিষয়টা দাঁড়ায় এই যে বছরের পর বছর ধরে এই অনিয়ম চলে আসছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জ্ঞাতসারেই।

বিজ্ঞাপন

এভাবে শুধু যে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা লঙ্ঘিত হয়ে আসছে তা নয়, স্বয়ং পরিকল্পনামন্ত্রীর সুস্পষ্ট নির্দেশনাও অগ্রাহ্য করা হয়ে আসছে। পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান প্রায় দুই বছর ধরে বিভিন্ন সভায় এক কর্মকর্তাকে একাধিক প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন না করার নির্দেশ দিয়ে এসেছেন, কিন্তু তাঁর নির্দেশে দৃশ্যত কেউই কর্ণপাত করেননি। এ মুহূর্তেও ১৪টি প্রকল্পের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন একজন কর্মকর্তা; দুজন কর্মকর্তার হাতে রয়েছে ১৩টি করে প্রকল্প; ৫ জনের প্রত্যেকে ১০টা বা তার বেশি; ১৪ জন কর্মকর্তা ৩ থেকে ৬টি করে এবং ৩৮ জন কর্মকর্তা প্রত্যেকে দুই বা তার বেশিসংখ্যক প্রকল্পের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন।

প্রথম আলোর মঙ্গলবারের প্রতিবেদনে এই হিসাব ছাপা হয়েছে খোদ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন পরিচালকের স্বাক্ষরিত একটি চিঠির সূত্র থেকে। সরকারের সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কাছে পাঠানো ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী, একাধিক প্রকল্পের পিডির দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের একটি প্রকল্পের দায়িত্ব নিজের হাতে রেখে অতিরিক্ত সব দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার জন্য সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে আগামী ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

আমরা মনে করি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় দেরিতে হলেও অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি পদক্ষেপ নিয়েছে। একজন কর্মকর্তাকে একটির বেশি প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়ার সঙ্গে অনৈতিক চর্চার সম্পর্ক আছে; এটা রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতির কারণও হয়: সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়িত হয় না, বাস্তবায়নের ব্যয় বাড়ে; অভীষ্ট উন্নত ব্যাহত ও বিলম্বিত হয়। তাই আমরা প্রত্যাশা করি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যেই একাধিক প্রকল্পের পরিচালকের দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তারা অতিরিক্ত প্রকল্পগুলোর দায়িত্ব ছেড়ে দেবেন এবং সেই সব প্রকল্পের প্রতিটির জন্য একজন যোগ্য পরিচালক নিয়োগ করা হবে, যাঁরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবেন।

সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন