‘ফ্রন্টিয়ার্স ২০২২: নয়েজ, ব্লেজেস অ্যান্ড মিসম্যাচেস’ শীর্ষক জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি ইউএনইপির বৈশ্বিক প্রতিবেদনে শব্দদূষণ কীভাবে মানুষের শারীরিক ও মানসিক সমস্যা প্রভাবিত করছে, সে বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, শব্দদূষণে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় পাঁচ শহরের তিনটির অবস্থানই দক্ষিণ এশিয়ায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গাইডলাইন বা নির্দেশনা অনুযায়ী মানুষের জন্য ঘরের ভেতর শব্দের গ্রহণযোগ্য মাত্রা ৫৫ ডেসিবেল। ঘরের বাইরে বাণিজ্যিক এলাকার জন্য ৭০ ডেসিবেল। অথচ ঢাকায় এ মাত্রা ১১৯ ডেসিবেল ও রাজশাহীতে ১০৩ ডেসিবেল। শব্দদূষণের প্রধান উৎস হলো সড়কে যানজটকালে যানবাহন থেকে নির্গত শব্দ, উড়োজাহাজ, ট্রেন, শিল্পকারখানা ও বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডে সৃষ্ট শব্দ। এসব শব্দ মানমাত্রার চেয়ে বেশি হলে তা মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যকে ঝুঁকিতে ফেলে।

শুধু রাজধানী ঢাকা নয়, সারা দেশেই শব্দদূষণ মাত্রাতিরিক্ত হারে বাড়ছে। যানজট বাধলেই চারপাশ থেকে হর্ন বাজানো শুরু হয় সব ধরনের যানবাহনের। বাড়িঘর ও অন্যান্য স্থাপনার নির্মাণকাজের শব্দ, উচ্চ স্বরে মাইক বাজানো হয়। স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক নিয়ম অনুযায়ী, শব্দের মাত্রা ৮৫ ডেসিবেল বা তার বেশি হলে তা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। অস্ট্রেলিয়ান একাডেমি অব সায়েন্সের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক নিবন্ধ থেকে জানা যায়, উচ্চ শব্দের মধ্যে থাকতে থাকতে একজন মানুষের শ্রবণশক্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। উচ্চ শব্দ মানুষের ঘুমেও ব্যাঘাত ঘটায়। উচ্চ শব্দে মানুষের উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্‌রোগ ও উদ্বেগজনিত সমস্যা দেখা দেয়। দিনের পর দিন শব্দদূষণের শিকার শিশুদের মনোযোগ দেওয়ার ও কিছু পড়ার ক্ষমতা লোপ পেতে পারে।

শব্দদূষণের এ ভয়াবহ চিত্র প্রকাশিত হওয়ার পর কর্তৃপক্ষের চৈতন্যোদয় হয়েছে বলে মনে হয় না। একজন কর্মকর্তা প্রতিবেদনের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ঢাকা শহরে শব্দদূষণের মাত্রা যে কতটা ভয়াবহ, তা পরিমাপ করতে গবেষণার প্রয়োজন হয় না। ঘরে-বাইরে প্রত্যেক নাগরিকই হাড়ে হাড়ে টের পান। ২০০৬ সালে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা জারি করা হলেও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নজির নেই। এর অবস্থা হয়েছে ‘কাজির গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই’-এর মতো। ঢাকার বাসিন্দারা যে মাত্রাতিরিক্ত হারে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন, তারও কারণ এ শব্দ ও বায়ুদূষণ। সরকার অন্তত এ বিষয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করে প্রতিকারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে।

ঢাকা শহরের বায়ু ও শব্দদূষণ কমাতে নাগরিক সচেতনতাও জরুরি। বিশেষ করে যখন-তখন যানবাহনের হর্ন বাজানো বন্ধ করতে হবে। যাঁরা আইন মানবেন না, তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। কতিপয় মানুষের দায়িত্বহীনতার কারণে আমরা দেড় কোটি মানুষের জীবনকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিতে পারি না।

সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন