কক্সবাজারে একটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘিরে অভূতপূর্ব গণবদলি ঘটেছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে পুলিশের তিনজন সাবেক মহাপরিদর্শকের সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁরা কেউই এই গণবদলিকে ইতিবাচক ঘটনা হিসেবে দেখেননি।

দুজন সাবেক আইজিপি মনে করেন, এতে পুলিশ প্রশাসনে বরং একটা ভুল বার্তা যেতে পারে। অপরাধ করলেন চিহ্নিত কয়েকজন, কিন্তু জাতির সামনে কাঠগড়ায় দাঁড়াল গোটা জেলার পুলিশ। প্রায় দেড় হাজার পুলিশের বদলি বিরল। এর অভিঘাত দেড় হাজার পুলিশ সদস্যের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনেও কম নয়। এসব পরিবারের যারা স্কুল-কলেজপড়ুয়া, তাদের করোনাকালে বাড়তি ভোগান্তির সম্মুখীন হতে হবে।

এ প্রসঙ্গে আমরা দুই সাবেক আইজিপির এই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত যে এই ঘটনা আইনের শাসনের শর্ত পূরণ করল না। কক্সবাজার অঞ্চলে মাদকের ব্যবসা, এর বিস্তার, ক্রসফায়ারের ঘটনা এবং পুলিশের গুলিতে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তার মৃত্যুর পর পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে যেসব গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, সেই প্রেক্ষাপটেই যে এই গণবদলি ঘটেছে, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এই গণবদলির মাধ্যমে সেখানকার পুলিশ বাহিনীর কিছু অভিযুক্ত সদস্য দায়মুক্তি পেলেন। ভুক্তভোগীদের বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা কমে গেল। আর যাঁরা ভালো পুলিশ, তাঁরা তো ‘সদাচরণকারী’। কিন্তু তাঁরা কার্যত তিরস্কৃত হলেন। এটা দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন নীতির পরিপন্থী।

বিজ্ঞাপন

একজন সাবেক আইজিপি অবশ্য বলেছেন, এই ব্যাপক বদলির মধ্য দিয়ে যদি ‘বিন্দুমাত্র উপকার’ মেলে, তাহলেও হয়তো একটা সান্ত্বনা পাওয়া যাবে। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি, কক্সবাজারে যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেটা অস্বাভাবিক ও অস্বচ্ছ। এর ভালো প্রভাব পড়ার যুক্তিসংগত কারণ নেই।

অভিযুক্ত পাবলিক সার্ভেন্টদের ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিতে ‘বদলি’ এবং বিভাগীয় ‘তদন্ত কমিটি’ গঠন দীর্ঘদিন ধরে একটা বর্ম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই ধারার যে একটা ভয়ানক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ঘটে গেছে, এই ঘটনায় তারই প্রমাণ মিলল।

ঐতিহাসিকভাবে কোনো পুলিশ সদস্য তাঁর নিজের জেলায় চাকরি করেন না। ১৮৬১ সালের পুলিশ আইনেই এটা বারণ। এই বিধান করার লক্ষ্য ছিল স্বজনপ্রীতি, পক্ষপাত বা সামাজিক প্রতিপক্ষের জন্য হুমকি হিসেবে গণ্য হওয়ার সুযোগ রোধ করা। মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডে জড়িত হিসেবে অভিযুক্ত প্রদীপ কুমার দাশ নিজের জেলায় না হলেও ঘুরেফিরে চট্টগ্রাম বিভাগেই চাকরিজীবনের উল্লেখযোগ্য সময় কাটিয়েছেন এবং বলাই বাহুল্য, এর ফলে সহজেই তিনি সেখানকার বিভিন্ন মহলের সঙ্গে স্বার্থের সম্পর্ক গড়ে তুলতে পেরেছেন। প্রদীপ কুমার শুধু বিচ্ছিন্নভাবে মন্দ কর্ম করেছেন, তা–ই নয়; পুলিশ প্রশাসনের বিদ্যমান ব্যবস্থাও তাঁকে ওই সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সাবেক আইজিপি নুরুল হুদা যথার্থই মনে করেন, যেসব ‘কারণে’ এসব বদলি, তা দূর না করলে এমন বদলি সুফল দেবে না। কিন্তু কারণ দূর করবে কে? মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে এই অপ্রিয় সত্যই ফুটে উঠেছে যে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে প্রদীপ কুমার পারদর্শী হয়ে উঠেছিলেন। ‘কৃতিত্বের’ জন্য রাষ্ট্র তাঁকে পুরস্কৃত করেছে। দেড় হাজার পুলিশের গণবদলির ঘটনা প্রদীপ কুমার ও তাঁর সহযোগীদের জন্য স্বস্তিদায়কই হওয়ার কথা। কারণ, তাঁরা আর বিচ্ছিন্ন কয়েকজন মাত্র নন। সন্দেহভাজন অভিযুক্ত ব্যক্তিদের তালিকা দীর্ঘ।

কক্সবাজারের ডেপুটি কমিশনার সোমবার আমাদের নিশ্চিত করেছেন, মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চার সদস্যের তদন্ত কমিটির রিপোর্টে কী আছে, সেটা এখনো জেলা প্রশাসনের অজানা। আমরা এই তদন্তের ফল এবং র‍্যাবের তরফে অভিযোগপত্র অবিলম্বে আশা করি। গণবদলির মতো মানুষের দৃষ্টি সরানোর চেষ্টার পুনরাবৃত্তি রোধ হোক। কেবল সততা ও মেধার ভিত্তিতে পদোন্নতি হোক। নিয়মতান্ত্রিক স্বচ্ছ বদলি এবং বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধের নীতি চালু হোক।

মন্তব্য পড়ুন 0