এক কোটির পরে এবার আরও ৫০ লাখ পরিবারকে ত্রাণ বিতরণের খবর বড় আশার সঞ্চার করেছে। কিন্তু উপযুক্ত লোকের হাতে উপযুক্ত পরিমাণে সহায়তা পৌঁছানোর চ্যালেঞ্জটি থাকছেই। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, বিশেষ করে সংকীর্ণ দলীয় বিবেচনায় ত্রাণ বিতরণ হতে পারে—এটাই সবচেয়ে বড় আশঙ্কা। নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে যে সম্পদের অভাবের কারণে নয়, সুষম বণ্টনের অভাবেও আমরা একটা গভীর সংকটে পড়তে পারি।

সুতরাং কত বেশি সংখ্যক মানুষকে কত বেশি পরিমাণে কেন্দ্রীয়ভাবে বিতরণ করা হলো সেই তথ্য-পরিসংখ্যানের এক রকম গুরুত্ব, আবার বিতরণ ঠিকঠাক হলো কি না, সেটির গুরুত্ব ভিন্ন। দুটোই যদি সন্তোষজনক হয়, তাহলেই আমরা কেবল নিরুদ্বিগ্ন হতে পারি। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য এবং এটা ইতিমধ্যে প্রমাণিত যে দেশ মহামারিকবলিত এবং জাতি আজ এক ভীষণ সংকটে পড়েছে বলেই সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো তেমন কোনো সংযম বা দয়ামায়া দেখাচ্ছে না। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ১৯ চেয়ারম্যানসহ ৫২ জন জনপ্রতিনিধিকে ত্রাণ চুরি বা অনিয়মে যুক্ত থাকার দায়ে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে আমাদের সমাজে এটাই বড় সত্য যে ত্রাণ বিতরণে ভয়ানক মাত্রায় স্বজনপ্রীতি ঘটে। সার্বিক বিচারে চুরি বা আত্মসাতের ঘটনার চেয়ে তা কোনো অংশে কম মারাত্মক নয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণেও আমরা কিন্তু সেই উদ্বেগের প্রতিফলন দেখতে পাই। তিনি নির্দিষ্টভাবে সতর্ক করেছেন, ত্রাণ বিতরণে যেন দলীয় পরিচয় না দেখা হয়। আমরা বিশ্বাস করি, সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায় থেকে দেওয়া এই নির্দেশনা এই মুহূর্তে বাস্তবায়নের দায়িত্ব ডেপুটি কমিশনারদের। প্রধানত তঁাদেরই এটা নিশ্চিত করতে হবে।

অপ্রিয় হলেও সত্য যে কোভিড-১৯ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ক্ষমতাসীন দলীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটা সক্রিয় ভূমিকার ঘাটতি চোখ এড়িয়ে যাওয়া নয়। বিচ্ছিন্নভাবে দেশের কোথাও কোথাও ক্ষমতাসীন দলের অনেকেই ভালো কাজ করছেন। কিন্তু সাংগঠনিকভাবে গোটা জনপ্রশাসনকে রাজনৈতিকভাবে পরিচালিত করা সম্ভব হয়নি। এমনকি তেমন প্রচেষ্টাও নজরে আসে না। এটা দুর্ভাগ্যজনক যে এ পর্যন্ত প্রায় অর্ধেক জেলাতেই ত্রাণ বিতরণে কোনো না–কোনো ধরনের অভিযোগ উঠেছে। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ডিলার বা ত্রাণ বিতরণকারী ব্যক্তিরা ক্ষমতাসীন দলের সংশ্লিষ্ট। সাহায্য পাওয়ার যোগ্য হিসেবে যে তালিকা তৈরি হচ্ছে, তা অনেক ক্ষেত্রেই দলীয় বিবেচনায়। সেই তালিকায় ধনী ও বিত্তবানদের নাম অন্তর্ভুক্তির খবর বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। স্থানীয় নেতারা সিংহভাগ ক্ষেত্রে অসদুপায় অবলম্বনকারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াননি। ৫২ অপসারিত জনপ্রতিনিধির মধ্যে প্রায় ৪০ জনই ক্ষমতাসীন দলীয়, কিন্তু বেশির ভাগ এখনো দলের ছত্রচ্ছায়ায় রয়েছেন। তাঁদের বহিষ্কার করতে হবে।

গণতন্ত্রের নামে স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দলীয়করণ করা হয়েছিল। আজ জাতীয় দুর্যোগকালে জাতিকে তার কুফল কীভাবে কতটা দিতে হয়, সেটাই একটা অগ্নিপরীক্ষা। ভিজিডি ও ভিজিএফের মতো তালিকা যে দেশে কার্যকর, সেই দেশে অভাবী পরিবার বা মানুষের সঠিক তালিকা তৈরিতে গলদঘর্ম হওয়ার কথা নয়। গত এক দশকে পরিবহনব্যবস্থা ও ডিজিটাল যোগাযোগ, উভয় মাধ্যমের বিরাট উন্নতি ঘটেছে। আমরা আমাদের জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়েও গর্ব করি। ত্রাণের ন্যায্য প্রাপকদের সঠিক তালিকা নিয়েও নিশ্চিত হতে পারি না। 

আমরা মনে করি, সুষ্ঠুভাবে ত্রাণ বিতরণের সঙ্গে এবারের দুর্যোগ মোকাবিলা, বিশেষ করে জনগণের খাদ্যনিরাপত্তার কার্যকরতা
সিংহভাগ নির্ভরশীল।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0