করোনা মহামারি প্রতিরোধে সরকার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তার মধ্যে কতটা সমন্বয় ও যূথবদ্ধতা ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। আমরা যখন এই প্রশ্ন তুলছি, তখন এ–ও স্বীকার করতে হবে যে করোনাকালে সরকার কিছু ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত অবস্থান নিতে পেরেছে, বিশেষ করে জীবন ও জীবিকার মধ্যে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে।
বাংলাদেশের মতো জনবহুল ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল একটি দেশে অনির্দিষ্টকাল অর্থনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ রাখা সম্ভব নয়। অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের দেওয়া আর্থিক প্রণোদনাও কিছু ক্ষেত্রে কাজে লেগেছে। এখানে বড় সমালোচনা হচ্ছে, এর সুফল কার্যত বড়রাই পেয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি, অদক্ষতা, যথাসময়ে ও কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যর্থতা সত্ত্বেও সরকার ত্বরিত কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে এবং সে কারণে স্বাস্থ্যসেবা খাতের সামগ্রিক দুর্দশা না কাটলেও হাসপাতালে শয্যা, আইসিইউ ও অক্সিজেন সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হয়েছে।
এই অবস্থার মধ্যে গত বছর করোনার প্রথম ধাক্কা মোটামুটি কাটানো গিয়েছিল। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থা তুলনামূলক স্বস্তিকর ছিল। কিন্তু এরই মধ্যে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে ভারত বিপর্যস্ত হয়েছে, যার অভিঘাত এসে পড়েছে বাংলাদেশেও। বিশেষজ্ঞরা সীমান্ত পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার সুপারিশ করলেও তা কার্যকর হয়নি। গত ৫ এপ্রিল সারা দেশে যে বিধিনিষেধ জারি হয়েছে, তা বাড়িয়ে ১৬ জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। এই বিধিনিষেধ এতটাই ঢিলেঢালাভাবে চলছে যে তা আদৌ কোনো কাজে দিয়েছে বলে মনে হয় না। আমরা দেখতে পাচ্ছি, পূর্ব আশঙ্কা অনুযায়ী করোনার ভারতীয় ভেরিয়েন্ট মৃত্যু ও সংক্রমণ দুটোই বাড়িয়েছে।
প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় অনেক হাসপাতালে শয্যার চেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছেন। হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকেরা। অনেক রোগী চাহিদা অনুযায়ী নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সেবা পাচ্ছেন না। করোনা সংক্রমণ বাড়তে থাকায় দুটি জেলা সম্পূর্ণ ও সাতটি জেলায় এলাকাভিত্তিক লকডাউন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেই লকডাউন তেমন কাজে আসছে বলে মনে হয় না। অনেকে লকডাউন অমান্য করে জেলার বাইরে চলে যাচ্ছেন। এতে সারা দেশে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই মুহূর্তে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার পাশাপাশি সংক্রমণ রোধ করাই সরকারের প্রধান কর্তব্য হওয়া উচিত। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মনে রাখতে হবে, ঢিলেঢালা লকডাউন সুফল দেবে না। লকডাউন এমনভাবে দিতে হবে, যাতে সেই এলাকা থেকে একজন মানুষও বাইরে না যেতে পারে। একইভাবে সীমান্ত পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হবে। অন্যথায় পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
আমাদের স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা এতটাই নাজুক যে রোগীর সংখ্যা কিছুটা বাড়লেই সরকার সামাল দিতে পারে না। সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে সংক্রমণ দ্রুত বাড়ার কারণে সেখানকার চিকিৎসা অবকাঠামো বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে না। এই অঞ্চলগুলোর জন্য অস্থায়ী হলেও জরুরি ভিত্তিতে কিছু তাৎক্ষণিক উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করে এবং বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতকে যুক্ত করে কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায়, তার উপায় বের করতে হবে। পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আগেই এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে হবে।
টিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা দূর করার জন্যও জরুরি উদ্যোগ দরকার। প্রথম দফা টিকা দেওয়া ১২-১৩ লাখ মানুষ দ্বিতীয় ডোজের জন্য অপেক্ষা করে বসে আছেন। সরকার স্বীকার করুক আর না-ই করুক, সব মিলিয়ে করোনা সংকট ঘনীভূত হয়ে উঠছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজন সর্বাত্মক ও বহুমুখী পদক্ষেপ। আর তা তখনই সম্ভব হবে, যখন সরকারের বিভিন্ন বিভাগ ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা যাবে।