default-image

স্বাধীনতার পরের ৫০ বছরে ভোলাবাসী আবশ্যকীয় উন্নয়ন থেকে নিশ্চয়ই বঞ্চিত থাকেনি। কিন্তু মাত্র ২১ লাখ মানুষের নদী ও সমুদ্রবিধৌত এই আবাসভূমির সবচেয়ে বড় যে চ্যালেঞ্জ, সেই শেখের বেড়িকে আজও সম্পূর্ণতা দেওয়া হয়নি। এর পরিণতি হলো প্রাকৃতিক দুর্যোগে নিয়মিত মানুষের প্রাণ নিভে যাওয়া এবং কোটি কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদহানি। এর চেয়ে বড় হলো অব্যাহত ভাঙনে উন্নয়ন ধ্বংস, অস্থিতিশীলতা ও অশান্তি ভোলাবাসীকে ঐতিহাসিকভাবে এক স্থানচ্যুত অভিবাসী জনগোষ্ঠীতে পরিণত করেছে। সে কারণেই সরকারি সমীক্ষায় দেখা যায়, দেশের সব জনপদে লোকসংখ্যা বাড়ে, কিন্তু ভোলায় তা কমে।

সাতটি উপজেলা নিয়ে গঠিত ভোলা জেলার পূর্বে মেঘনা, উত্তরে ইলিশা, পশ্চিমে তেঁতুলিয়া ও দক্ষিণ ভাগ সাগর মোহনা দ্বারা বেষ্টিত। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ছোবল হেনেছিল সম্পূর্ণরূপে অরক্ষিত (না ছিল বেড়ি, না ছিল আশ্রয়কেন্দ্র) ভোলায়। সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়া সেই দুঃসহ স্মৃতি আজও ভোলাবাসীকে তাড়া করে। সেই দুর্যোগে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দায়িত্বহীনতা ফুটে উঠেছিল। যার দাঁতভাঙা জবাব তারা পেয়েছিল ঝড়ের পরের সাধারণ নির্বাচনে এবং অবশ্যই স্বাধীনতার সুফল ভোলাবাসীকে পৌঁছে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

বিজ্ঞাপন

জোয়ার-জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা পেতে সে সময়ের সামর্থ্য অনুযায়ী ১৯৭২ সালে ভোলার মূল ভূখণ্ডের (দুর্গম বিচ্ছিন্ন মনপুরা তখন তজুমদ্দিন থানার অংশ) চারদিকে বিস্তৃত ২৭০ কিলোমিটার মাটির বাঁধ তৈরি করেছিলেন তিনি (বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ৩৫০ কিলোমিটার)। সেই থেকে তা ‘শেখের বেড়ি’ হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। তবে কালের আবর্তে সেই বাঁধ স্থানে স্থানে সরু ও ভঙ্গুর হয়ে গেছে। ১৯৭২ সালের পর কোথাও কোথাও প্রায় ৭ কিলোমিটার জমি ভেঙে বিলীন হয়েছে।

গত ৫০ বছরে ভোলা হারিয়েছে ২৫১ বর্গকিলোমিটার জমি। ভাঙন প্রতিরোধে প্রতি কিলোমিটারে ১০০ কোটি টাকা খরচ করে অনধিক ৩০ কিলোমিটার (২৯ দশমিক ৫ কিলোমিটার) তীরে আধুনিক ব্লক বাঁধ তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। বর্তমানে আরও পাঁচটি প্রকল্পের আওতায় আরও ২২ কিলোমিটার তীরে ব্লক বাঁধ তৈরির কাজ চলমান। কিন্তু শেখের বেড়ি আধুনিক হয়নি। আসলে বিভিন্ন সরকার বিভিন্ন আমলে খণ্ডিতভাবে বাঁধ সংস্কার করেছে। এর ফলে তা প্রকৌশলগতভাবে দুর্বল থাকে। মানুষের নিরাপত্তা ও উন্নয়ন কোনোটিই তা টেকসই করতে পারে না।

তজুমদ্দিনে প্রায় দুই কোটি টাকায় বিদ্যালয় ভবন, চরফ্যাশনে কোটি টাকায় ইউপি ভবন, দৌলতখানে দুই কোটি টাকায় আশ্রয়কেন্দ্র এবং দেড় কোটি টাকায় তিনটি স্কুল তৈরির পরপরই ভাঙন সে সবকিছু কেড়ে নেয়। সমগ্র ভোলায় সরকারি অর্থের এ রকম অভাবনীয় উন্নয়নের অপচয় কত বেশি, তার ওপর একটা সমীক্ষা দরকার।

বছরে প্রায় ২ লাখ মেট্রিক টন মাছ, ২ হাজার মেট্রিক টন উদ্বৃত্ত ধান, গ্যাসের রিজার্ভ থেকে উৎপাদিত প্রায় ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় সঞ্চালন লাইনে সরবরাহকারী ভোলার দুঃখ ঘোচাতে নীতিনির্ধারকদের নতুন করে নীতিনির্ধারণের সময় এসেছে।

সত্তরের ঘূর্ণিঝড়ে ৯১ জন স্বজনহারানো আবদুল মালেকের (৭৪) কণ্ঠে আজ ধ্বনিত সব ভোলাবাসীর কণ্ঠ। তাঁর কথায়, সরকার আসে সরকার যায়, ভোলা রক্ষায় টেকসই বাঁধ হয় না। আমরা আশা করব, ভোলাবাসীর চোখের পানি ঘুচবে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে শেখের বেড়িকে সম্পূর্ণতা দিতে যথাযথ পরিকল্পনা নেওয়া হোক।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0