ব্যবস্থাপনার উন্নতি ও জবাবদিহি চাই

কোভিডের ছয় মাস

বিজ্ঞাপন

গতকাল ৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে কোভিড–১৯ মহামারি শুরুর ছয় মাস পূর্ণ হলো। ৮ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম কোভিড রোগী শনাক্ত হওয়ার পর থেকে পরবর্তী ৬ মাসে এই রোগে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন ৩ লাখ ২৯ হাজার ২৫১ জন; মোট মারা গেছেন ৪ হাজার ৫৫২ জন; মোট সুস্থ হয়েছেন ২ লাখ, ২৭ হাজার ৮০৯ জন। শনাক্ত রোগীর সংখ্যার বিচারে বিশ্বে আমাদের অবস্থান ১৪তম এবং মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে ২৯তম। ছয় মাসের মাথায় সংক্রমণের গতি কিছুটা ধীর হয়েছে বলে বলা হচ্ছে, তবে পরীক্ষার সংখ্যা ও শনাক্ত রোগীর সংখ্যার বিচারে দেখা যাচ্ছে, সংক্রমণের হার এখনো উচ্চই রয়ে গেছে। গত ছয় মাসের সংক্রমণের গড় হার ছিল ১৯ দশমিক ৯০ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কমিউনিটি ইনফেকশন বা সামাজিক পর্যায়ের সংক্রমণ অব্যাহত আছে বলেই সংক্রমণের হার এখনো বেশি।

আমরা মনে করি, গত ছয় মাসে সরকারের কোভিড মোকাবিলা কার্যক্রমের পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন হওয়া উচিত। তাহলে আমরা অতীতের ভুলত্রুটি–সীমাবদ্ধতা ইত্যাদির আলোকে সামনের দিনগুলোর করণীয় নির্ধারণ করতে সক্ষম হব।

গত ছয় মাসে আমরা মোটা দাগে যা দেখলাম, তার মধ্যে প্রথমেই উল্লেখযোগ্য বিষয়টি হলো এই যে কোভিড–১৯ মোকাবিলা করতে গিয়ে আমাদের পুরো চিকিৎসাব্যবস্থাই ভেঙে পড়েছে। কোভিডে আক্রান্ত হননি, এমন সাধারণ রোগীদেরও হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা পাওয়ায় ব্যাপক বিঘ্ন ঘটেছে। প্রথম দিকে অনেক সাধারণ রোগী হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরে ঘুরেও চিকিৎসা পাননি। সরকারি–বেসরকারিনির্বিশেষে সব হাসপাতাল–ক্লিনিকে একই হতাশাব্যঞ্জক চিত্র দেখা গেছে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

দ্বিতীয়ত, কোভিড–১৯ মোকাবিলা কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের ব্যাপক অব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহির ঘাটতির চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। এন–৯৫ মাস্ক, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) ও অন্যান্য চিকিৎসাসরঞ্জাম কেনা ও বিতরণের ক্ষেত্রে নজিরবিহীন দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। কোভিড পরীক্ষায় প্রতারণা, ভুয়া রিপোর্ট দেওয়ার কেলেঙ্কারিতে দেশে–বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির ক্ষতি হয়েছে।

তৃতীয়ত, কোভিড সংক্রমণের বিস্তার রোধের ক্ষেত্রে প্রাথমিক করণীয় হিসেবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পুনঃপুন তাগিদ সত্ত্বেও দ্রুত বিপুলসংখ্যক মানুষের কোভিড পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। প্রথম দিকে শুধু সরকারি সংস্থার হাতেই পরীক্ষার এখতিয়ার সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল; বেসরকারি কোনো সংস্থাকে পরীক্ষার অনুমোদন দেওয়া হয়নি দীর্ঘ সময় ধরে; সরকার নিজেও দ্রুত পর্যাপ্তসংখ্যক পরীক্ষাকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেয়নি। এখনো দেশের ৩৮টি জেলায় সরকারি বা বেসরকারি কোনো ধরনের পরীক্ষাকেন্দ্রই নেই।

আসলে পরীক্ষার সংখ্যাস্বল্পতা এবং উচ্চ হারে সংক্রমিত রেড জোনগুলোতে লকডাউন বাস্তবায়নে ব্যর্থতাসহ নানা কারণে সংক্রমণ দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে এবং ঢাকার বাইরেও বিপুলসংখ্যক মানুষ সংক্রমিত হয়েছেন। আর সর্বসাম্প্রতিক প্রবণতা লক্ষ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণের ঝুঁকির মুখোমুখি। তাহলে এখন করণীয় কী?

প্রথমত, পরীক্ষার সংখ্যা অবশ্যই আরও বাড়াতে হবে। কমিউনিটি সংক্রমণ আর বাড়তে দেওয়া চলবে না। সে জন্য মাস্ক পরাসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে সরকারের বাড়তি তৎপরতা প্রয়োজন। স্থানীয় সরকারকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে সামাজিক–সাংস্কৃতিক সংগঠন, এনজিও, যুবসমাজের সহযোগিতা নিয়ে পাড়া-মহল্লাভিত্তিক স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের ক্ষেত্রে উন্নতি ঘটাতে হবে। আর যেহেতু কোভিডে মৃত্যু বাড়ছে, জটিল রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, সেহেতু কোভিড হাসপাতালগুলোর চিকিৎসাক্ষেত্রে আরও উন্নতি ঘটাতে হবে। অক্সিজেন সরবরাহ, আইসিইউ সেবা বাড়াতে হবে। হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যাপারে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে রোগীর অবস্থা জটিল-গুরুতর হওয়ার আগেই হাসপাতালে নেওয়া হয়; কারণ, অনেক রোগীকে হাসপাতালে আনা হচ্ছে একদম শেষ সময়ে।

সর্বোপরি, কোভিড চিকিৎসাসহ সামগ্রিক চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা আরও উন্নত করতে হবে। সে জন্য দায়িত্বশীলদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন