default-image

পরপর দুই দিন প্রতি ২৪ ঘণ্টায় মারা গেলেন ৪৫ জন করে। দুই দিনই প্রতি ২৪ ঘণ্টায় শনাক্তকরণ পরীক্ষার সংখ্যার অনুপাতে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ৫ হাজারের বেশি। প্রথম ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত রোগীর হার ১৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ। পরের ২৪ ঘণ্টায় বেড়ে হলো ১৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ। এক বছরের বেশি সময় ধরে চলমান কোভিড-১৯ মহামারির এই সর্বসাম্প্রতিক চিত্র নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। এই উদ্বেগ সরকারি সিদ্ধান্তেও যথার্থভাবেই প্রতিফলিত হয়েছে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নতুন করে বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ১৮ দফা নির্দেশনাসহ একটি প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করেছে; পরিস্থিতির আরও অবনতি রোধ করতে হলে এই প্রজ্ঞাপনের সর্বোচ্চ মাত্রায় বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়াই এই মুহূর্তের প্রধান অগ্রাধিকার।

নতুন করে সংক্রমণ বৃদ্ধির এই প্রবণতা রোধ করে মহামারি মোকাবিলার চলমান সব তৎপরতার সাফল্য নিশ্চিত করতে হলে আমাদের গত এক বছরের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে তা থেকে শিক্ষা নিতে হবে, সেই শিক্ষা কাজে লাগিয়ে অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি বন্ধ করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা তো বলছেনই, সাধারণ দৃষ্টিতেও এটা পরিষ্কার যে করোনাভাইরাসের মতো অতিসংক্রামক রোগের সংক্রমণ রোধের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়ে সর্বসাধারণ পর্যায়ে ব্যাপক শিথিলতার কারণেই নতুন করে সংক্রমণ বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। গত বছরের যে সময়ে সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছিল, এ বছরও সেই সময়েই তা আবার নতুন করে বাড়তে শুরু করেছে। কিন্তু গত বছর দীর্ঘ সাধারণ ছুটি, নানা মাত্রার লকডাউন এবং ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করার যেটুকু প্রয়াস লক্ষ করা গিয়েছিল, দুঃখজনকভাবে এখন তা অনুপস্থিত। এটাই এখনকার সবচেয়ে বড় ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়।

বিজ্ঞাপন

এই পরিস্থিতিতে সরকারের ঘোষিত ১৮ দফা নির্দেশনা বাস্তবায়নের সর্বাত্মক প্রয়াস প্রয়োজন। কিন্তু সরকারের একার পক্ষে তা সম্ভব নয়। গণপরিবহনে অর্ধেক যাত্রী পরিবহনের নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত উভয় পক্ষের আন্তরিকতা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে অবহেলা বা দায়িত্ববোধের অভাব দেখা দিলে তার নিয়মানুগ প্রতিকারের পদক্ষেপও নিশ্চিত করতে হবে। অফিস-আদালত, কলকারখানাসহ সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের (জরুরি সেবাপ্রতিষ্ঠানগুলো ছাড়া) কাজকর্ম অর্ধেক জনবল দিয়ে চালিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্যও প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে প্রথমত আন্তরিকভাবে তৎপর হতে হবে; তবে এই ক্ষেত্রে সরকারি নজরদারির প্রয়োজন হতে পারে।

করোনাভাইরাস মানুষে মানুষে সংস্পর্শ ছাড়া ছড়াতে পারে না—এই বৈজ্ঞানিক সত্য মনে রেখে সবাইকে জনসমাগম যথাসম্ভব সীমিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ১৮ দফার মধ্যে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। মহামারির একদম প্রাথমিক পর্যায় থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই বিষয়ের ওপরেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব আরোপ করে এসেছে এবং এখনো তা একই রকম গুরুত্বপূর্ণ রয়ে গেছে। আমরা ইতিমধ্যে জানি, মাস্ক ব্যবহার করা, ঘন ঘন হাত ধোয়া, শারীরিক ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা ও কাজকর্ম চালিয়ে নেওয়া—স্বাস্থ্যবিধির এই দিকগুলো মেনে চললে সংক্রমণ বৃদ্ধি এড়ানো সম্ভব। এটা অনেক দেশেই প্রমাণিত হয়েছে, এমনকি আমাদের দেশেও।

সংক্রমণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুর হারও বাড়ছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ছে, আইসিইউ সেবার প্রয়োজন হচ্ছে এমন রোগীর সংখ্যাও ইতিমধ্যে অনেক বেড়েছে এবং আরও বাড়ছে। সুতরাং কোভিড চিকিৎসার ক্ষেত্রেও এখন বাড়তি মনোযোগ দিতে হবে। বিশেষত অক্সিজেন প্রাপ্তির নিশ্চয়তা এবং আইসিইউ সেবা ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিতে হবে, যাতে কোভিড রোগীদের মৃত্যুর হার যথাসম্ভব কম রাখা যায়।

দ্বিতীয় পর্যায়ে সংক্রমণ বৃদ্ধি একটি বড় জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে সামনে চলে এসেছে, এটা সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলার জন্য সবার সম্মিলিত প্রয়াস একান্ত জরুরি।

সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন