default-image

কোভিড মহামারির দ্বিতীয় ঢেউয়ের ধাক্কায় চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর যে বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তা সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হলে কোভিড চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র, চিকিৎসা সরঞ্জাম, চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক ও অন্যান্য লোকবলের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম এবং রোগ শনাক্তকরণ কিটের মজুত নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন। কিন্তু গতকাল মঙ্গলবার প্রথম আলোয় এ িবষয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের বক্তব্যে সমন্বয়হীনতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মহামারির এই গুরুতর পর্যায়ে এটা উদ্বেগের বিষয়।

কেন্দ্রীয় ঔষধাগার বলেছে, মহামারির দ্বিতীয় ঢেউ আসার পর সুরক্ষাসামগ্রী ও চিকিৎসা সরঞ্জামের চাহিদা বেড়ে গেছে। ফলে এসব সামগ্রীর মজুত দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। ৮ এপ্রিল পর্যন্ত তাদের কাছে যে পরিমাণ মজুত ছিল বলে তারা স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবকে জানিয়েছিল, তা দিয়ে ১৫ থেকে ২০ দিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হতে পারে। তারপর ১১ দিন পেরিয়ে গেছে, এখন এসব সামগ্রীর মজুতের প্রকৃত পরিমাণ কত এবং তা দিয়ে আরও কত দিনের চাহিদা পূরণ হতে পারে, তা একটা জরুরি প্রশ্ন। আবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেছেন, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও সুরক্ষাসামগ্রীর বর্তমান মজুত নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু তাঁরা বলেননি, বিদ্যমান মজুত দিয়ে তাঁদের হিসেবে আর কত দিনের চাহিদা পূরণ করা যাবে।

কেন্দ্রীয় ঔষধাগার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেরই অধীন প্রতিষ্ঠান, তারা চিকিৎসা সরঞ্জাম ও সুরক্ষাসামগ্রীর মজুত কমে আসার পরিপ্রেক্ষিতে মজুত বাড়ানোর জন্য এসব সরঞ্জাম ক্রয়ের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে একাধিকবার অবহিত করেছিল। তারা ১ এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে একটি চিঠি লিখে পরবর্তী দুই কার্য দিবসের মধ্যে ছয় মাসের ক্রয় পরিকল্পনা তৈরি করে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে পাঠাতে বলেছিল; কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এ বিষয়ে কোনো পূর্ণাঙ্গ ক্রয় প্রস্তাব পাঠায়নি।

বিজ্ঞাপন

তারপর কেন্দ্রীয় ঔষধাগার ৮ এপ্রিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবকে এক চিঠিতে চিকিৎসা উপকরণ ও সরঞ্জামের মজুতের সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করে। সরকারি ক্রয়বিধির সব বিধিবিধান অনুসরণ করে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে ক্রয় সম্পাদন করে পণ্য সরবরাহ পেতে ন্যূনতম তিন মাস লেগে যায়; এমনকি সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে কেনাকাটা করলেও সরবরাহ পেতে এক থেকে দেড় মাস লাগে। কেন্দ্রীয় ঔষধাগার স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবের কাছে পাঠানো চিঠিটির অনুলিপি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও পাঠিয়েছিল। তারপর স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে চিকিৎসাসামগ্রীর চাহিদাপত্র পাঠানোর তাগিদ দিয়ে চিঠি পাঠায় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর চিঠি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাড়াহুড়ো করে একটি ক্রয় প্রস্তাব স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে পাঠায়। কিন্তু স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেছেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাঠানো ক্রয়প্রস্তাবটি অপূর্ণাঙ্গ এবং সে কারণে অগ্রহণযোগ্য। ফলে তাদের আবারও পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব পাঠাতে বলা হয়েছে।

চিঠি চালাচালির এই প্রক্রিয়া থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পরিস্থিতির নাজুকতা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হচ্ছে, কিংবা আমাদের পক্ষে দুর্বোধ্য কোনো কারণে তারা এই জরুরি বিষয়টির প্রতি যথাসময়ে যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি। এখন কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পরিচালক যেমনটি আশঙ্কা করছেন, ‘স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ক্রয়প্রস্তাব পাঠাতে দেরি করায় আমরা সুরক্ষাসামগ্রী ও চিকিৎসা সরঞ্জামের দিক থেকে বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারি।’

কিন্তু কোনোভাবেই যেন তেমন সংকট সৃষ্টি না হয়, তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। এই ক্ষেত্রে ব্যর্থতার জন্য সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি নিশ্চিত করাও একান্ত জরুরি। কারণ, জবাবদিহির অভাবেই অতীতে নানা ধরনের সমস্যা-সংকটে পড়তে হয়েছে।

সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন