পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি জনঘনত্বের দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। মাত্র ১ লাখ ৪৭ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ দেশে প্রায় ১৭ কোটি মানুষের বাস। উপরন্তু কৃষিজমির পরিমাণ ক্রমেই আরও কমে যাচ্ছে। এ দেশে সব মানুষের পেট পুরে খাবার জোগানো সত্যিই এক বড় সমস্যা ছিল। বিশেষত আশ্বিন-কার্তিক মাসে ‘মঙ্গা’ শব্দটির বহুল ব্যবহারের স্মৃতি এখনো মলিন হয়ে যায়নি। তবে সুখের বিষয়, এ দেশের কোনো অঞ্চলে আজ আর মানুষ অনাহারে মারা যায় না। গুরুতর প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী খাদ্যাভাবে কষ্ট পাওয়ার ঘটনাও এখন ঘটে না বললেই চলে।

সর্বশেষ সুখবর হলো, ক্ষুধা দূর করার ধারাবাহিক সংগ্রামে বাংলাদেশ বৈশ্বিক সূচকে গত এক বছরে ১৩ ধাপ সামনে এগিয়ে গেছে। সম্প্রতি কনসার্ন ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ও ওয়েল্ট হাঙ্গার হিলফের যৌথ প্রতিবেদনের সূত্রে জাতীয় সংবাদমাধ্যমে এ খবর ছাপা হয়েছে। গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সের (জিএইচআই) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের বিশ্ব ক্ষুধাসূচকে ১০৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৭৫তম। গত বছর একই সূচকে ১১৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৮৮। এ ক্ষেত্রে আমরা ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে রয়েছি।

বিজ্ঞাপন

কোভিড-১৯ মহামারির এ দুঃসময়ে আরও একটি সুখবর হলো মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ভারতকে ছাড়িয়ে যেতে চলেছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলছে, ২০২০ পঞ্জিকাবর্ষে বাংলাদেশে মাথাপিছু জিডিপি হবে ১ হাজার ৮৮৮ ডলার; আর ভারতের তা হবে ১ হাজার ৮৭৭ ডলার। মূলত করোনার এই সময়ে ভারতের অর্থনীতি বেশি মাত্রায় সংকুচিত হবে, সে তুলনায় বাংলাদেশে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হবে। চলতি বছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হবে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ, ভারতের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমবে ১০ দশমিক ৩ শতাংশ। আইএমএফের পূর্বাভাস ঠিক থাকলে বাংলাদেশ শুধু ভারত নয়, পাকিস্তান ও নেপালকেও অতিক্রম করে যাবে। যদিও পরের বছরেই ভারতের প্রবৃদ্ধি অনেক বাড়বে বলে আইএমএফের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে।

কোভিড-১৯ মহামারিতে বৈশ্বিক অর্থনীতি যখন পর্যুদস্ত, তখন বাংলাদেশের এসব অর্জনের খবর থেকে এমন আভাস মেলে যে আমাদের জনগণের প্রতিকূল অবস্থা সামলে ওঠার সক্ষমতা উৎসাহব্যঞ্জক। যদিও ক্ষুধাসূচকে আমাদের ১৩ ধাপ অগ্রগতির একটি অংশ মহামারি শুরু হওয়ার আগেই ঘটেছে। তবু লক্ষণীয় বিষয় হলো চলমান মহামারিকালে আয়রোজগার হারানো দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর খাদ্যনিরাপত্তার গুরুতর বিপর্যয় ঠেকানো গেছে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে অনেক খাদ্য ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষেরা অসহায় নিরন্ন মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

ক্ষুধা দূর করার ক্ষেত্রে এক বছরে ১৩ ধাপ অগ্রগতি একটা বড় অর্জন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে ক্ষুধার বৈশ্বিক সূচকের প্রাপ্ত স্কোরের ভিত্তিতে বলা হচ্ছে, আমাদের দেশে ক্ষুধার মাত্রা এখনো ‘গুরুতর পর্যায়ে’ রয়ে গেছে। অর্থাৎ ক্ষুধার বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রামে আমাদের অনেক অগ্রগতি হয়েছে ভেবে স্বস্তি পাওয়ার বা তৃপ্ত হওয়ার সুযোগ নেই। এ সংগ্রামে আমাদের আরও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। বিশেষত চলমান কোভিড-১৯ মহামারি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় যে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে, তার ফলে তাদের জীবনমান কমে যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষত নারী, শিশু ও কিশোরীদের পুষ্টি পরিস্থিতির অবনতির যে আশঙ্কা ব্যক্ত করা হচ্ছে, তা এড়াতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। মহামারি আরও দীর্ঘস্থায়ী হলে এ বিষয়ে হয়তো বিশেষ খাদ্য পুষ্টি কর্মসূচি নেওয়ার প্রয়োজন হবে।

বৈশ্বিক ক্ষুধাসূচক ও ক্ষুধার মাত্রা নির্ধারণের ক্ষেত্রে অপুষ্টির মাত্রা, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের খর্বতা, কৃশতা, শিশুমৃত্যুর হার ইত্যাদি বিবেচনায় নেওয়া হয়। সুতরাং এ ক্ষেত্রে আরও অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্যতালিকায় পুষ্টিকর খাবার যুক্ত করার ওপরে জোর দিতে হবে।

মন্তব্য পড়ুন 0