default-image

দেশের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র খাতুনগঞ্জের জলাবদ্ধতা নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান কিছু কিছু পদক্ষেপও নিয়েছে। কিন্তু সেসব উদ্যোগ আয়োজন যে কোনো কাজে আসেনি, খাতুনগঞ্জের ক্রমাবনতিশীল অবস্থাই তার প্রমাণ। চট্টগ্রাম চেম্বারের সহযোগিতায় সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের ন্যাশনাল রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে গত এক দশকে খাতুনগঞ্জ এবং এর পাশের আছদগঞ্জ ও কোরবানীগঞ্জে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ২ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পাঁচ হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

গবেষণায় আর্থিক ক্ষতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে পাঁচ ধরনের হিসাব বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে আছে জলাবদ্ধতা, অবকাঠামো ও সম্পদের ক্ষতি, অবকাঠামো খাতে বাড়তি বিনিয়োগ, পরিবহনসেবা ও শ্রম খাতে কর্মঘণ্টা নষ্ট এবং যানজটে বাড়তি পরিচালন ব্যয়। ব্যবসায়ীরা বলেছেন, জলাবদ্ধতার কারণে প্রতিবছর ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে। দোকান বা গুদামে পানি ঢুকে পণ্য নষ্ট হচ্ছে। অনেকের গুদাম পরিত্যক্ত হয়েছে। কম দামেও পণ্য বিক্রি করতে হয় ব্যবসায়ীদের।

প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, খাতুনগঞ্জে বর্তমানে ৫৫ দশমিক ৯০ শতাংশ এলাকাজুড়ে ভবন আছে। খাল–নালাসহ জলাধার আছে মাত্র ৭ দশমিক ৮০ শতাংশ। দিনে ২০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হলেই চাক্তাই খালসহ আশপাশের খালে পানির উচ্চতা ৪ দশমিক ১ মিটার বেড়ে যায়। এতে প্রধান সড়কে ১ মিটারের উঁচু পানি জমে যায়। এ অবস্থায় খাতুনগঞ্জ থেকে ব্যবসার ৫০ শতাংশ অন্যত্র চলে গেছে।

বিজ্ঞাপন

গবেষণায় খাতুনগঞ্জের সমস্যা সমাধানে ১৭ দফা সুপারিশ করা হয়েছে। যার মধ্যে চাক্তাই খাল খনন, বহুমুখী পণ্য পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং জলাধার ও সবুজ এলাকা বাড়ানোর কথা আছে। চট্টগ্রাম সিটি মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ‘খাতুনগঞ্জের এই আর্থিক ক্ষতির জন্য দায়ী আমরাই। চাক্তাই খাল দখল করে ও পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করেছেন ব্যবসায়ী বা প্রভাবশালীরা।’ অতীতে তাঁর পূর্বসূরিরাও এককই রকম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেননি।

খাতুনগঞ্জ দেখভালের দায়িত্ব তিনটি প্রতিষ্ঠানের—চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের। এই
তিন কর্তৃপক্ষের কাজে কোনো সমন্বয় নেই। যে যার মতো করে প্রকল্প নেয় এবং তা সমস্যা নিরসন করতে ব্যর্থ হয়েছে। খাতুনগঞ্জের জলাবদ্ধতা নিরসনে গবেষকেরা জলাধার নির্মাণ ও ইউ ম্যাপ মডেল ব্যবহারের সুপারিশ করেছেন। কিন্তু সে জন্য চাক্তাই খালকে দখলমুক্ত করতে হবে। বর্তমানে সেখানে যে প্রায় ৫৬ শতাংশ এলাকাজুড়ে ভবন আছে, তা অক্ষত রেখে কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যাবে না। প্রয়োজনে খালের জন্য জায়গা ছেড়ে দিয়ে সেখানে বহুতল ভবন করা যেতে পারে। চট্টগ্রাম সিটি মেয়রের কথার প্রতিধ্বনি তুলে আমরাও বলতে চাই, চাক্তাই খাল উদ্ধারের এখনই সময়।

একদা হোয়াং হো নদীকে বলা হতো চীনের দুঃখ। প্রতিবছর বন্যায় বিস্তীর্ণ এলাকার ঘরবাড়ি ও ফসল ডুবে যেত। চীনারা সেই হোয়াং হোকে সুখ ও সমৃদ্ধির উৎস করতে পেরেছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ করে। খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের দুঃখ–কষ্ট ঘুচবে কি না, তা নির্ভর করছে জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপের ওপর।

সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন