স্বাধীনতার লক্ষ্য ছিল একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও অসাম্প্রদায়িক দেশ গঠন; যেখানে দলমত, ধর্ম–সম্প্রদায়নির্বিশেষে দেশের প্রতিটি মানুষের মৌলিক চাহিদা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত হবে। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রেও বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করার কথা আছে।

আজকের দিনে আমরা ইতিহাসের মহানায়ক ও শহীদদের স্মরণ করব। সেই সঙ্গে আত্মবিশ্লেষণ করব—আমরা কত দূর এগিয়েছি, কত দূর এগোতে পারতাম। গত ৫১ বছরে আমাদের যেমন অসামান্য সফলতা আছে, তেমনি ব্যর্থতাও কম নয়। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দেশের বিরাট অগ্রগতি হয়েছে; একদা খাদ্যঘাটতির দেশ খাদ্যে প্রায় স্বনির্ভর হয়েছে; দেশে নারীশিক্ষার প্রসার ঘটেছে; স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারিত হয়েছে; স্বল্পোন্নত দেশের সীমা পেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে চলে এসেছে। এসব নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।

এসব সাফল্যের পেছনে যে সাধারণ মানুষের ঘাম ও শ্রম যুক্ত, তঁাদের জীবনমান কতটা বেড়েছে? স্বাধীনতার ৫১ বছর পরও আমরা শ্রমিক-কৃষকসহ সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদা তথা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ নিশ্চিত করতে পারিনি। এখনো জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য অংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। করোনাকালের ধাক্কা না সামলাতেই নতুন করে তাদের ওপর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির খাঁড়া ঝুলছে। বাণিজ্যমন্ত্রীও স্বীকার করেছেন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি মধ্যবিত্তরাও টিসিবির গাড়ির সামনে লাইন দিচ্ছেন। যদি আমরা বৈষম্য কমাতে না পারি, তাহলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল দেশের ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠীর হাতেই থাকবে, বৃহত্তর জনগণের কোনো উপকারে আসবে না।

স্বাধীনতার উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, ৫১ বছরেও আমরা তা থেকে অনেক দূরে আছি। সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ বলে অভিহিত করলেও আমরা জনগণের প্রতিনিধি বাছাই করার বিষয়ে একটি সর্বসম্মত রীতি আজও চালু করতে পারলাম না। জাতীয় ও স্থানীয় সব নির্বাচনই এখন প্রশ্নবিদ্ধ।

তাই স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে আত্মজিজ্ঞাসার সময় এসেছে—আমরা কি বৈষম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক উন্নতি নিয়ে সন্তুষ্ট থাকব? আমরা কি ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে মেনে নেব, না একে শক্তিশালী করব? আমরা কি সব বিষয়ে রাজনৈতিক বিভাজন ও বৈরিতা জিইয়ে রাখব, না জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐক্যের পথে এগোব? আমরা কি অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি আইনের শাসন, মানবাধিকার ও বাক্‌স্বাধীনতা সমুন্নত রাখতে সচেষ্ট হব? স্বাধীনতা দিবসের প্রত্যাশা, গণতন্ত্রের অভিযাত্রা সংহত হোক।

সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন