default-image

বাঁশখালীতে এস আলম গ্রুপের নির্মাণাধীন কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রে বকেয়া মজুরি ও রোজার দিনে কাজের সময় কমানোর দাবিতে শ্রমিকদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পাঁচ শ্রমিকের মৃত্যু অগ্রহণযোগ্য ও চরমভাবে নিন্দনীয়। কোনো দাবিদাওয়া নিয়ে শ্রমিক অসন্তোষ বা বিক্ষোভ হতেই পারে, সেটা থামানোর একমাত্র পথ কি গুলি করে শ্রমিক হত্যা?

বিদ্যুৎকেন্দ্রের শ্রমিকেরা কিছু দাবি তুলেছিলেন। যার মধ্যে ছিল বকেয়া বেতন পরিশোধ এবং ইফতার ও সাহ্‌রির সময় ছুটি দেওয়া। এ ধরনের দাবি কি খুব অযৌক্তিক? যদি তা না হয়, তাহলে পাওয়ার প্ল্যান্ট তৈরির কাজ করতে গিয়ে কেন পাঁচ শ্রমিককে জীবন দিতে হলো? উল্লেখ্য, এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে এটাই প্রথম প্রাণঘাতী ঘটনা নয়। ২০১৬ সালে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনকালে স্থানীয় লোকজন যখন এর বিরোধিতায় নেমেছিলেন, তখনো বিক্ষোভ দমনের সময় চারজন প্রাণ হারান।

প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, বাঁশখালী কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রায় ছয় হাজার শ্রমিক কাজ করেন। তাঁরা কর্তৃপক্ষের কাছে মার্চ মাসের বকেয়া বেতন চেয়েছিলেন, যাতে রোজার দিনে গ্রামে পরিবারের সদস্যদের কাছে পাঠাতে পারেন। এ ছাড়া রোজার দিনে কাজের সময় কমিয়ে ৯ ঘণ্টা থেকে ৬ ঘণ্টা করা এবং ইফতার ও সাহ্‌রির সময় বিরতি দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। তাঁরা বলেছেন, প্রতি মাসের ৫ তারিখের মধ্যে বেতন পরিশোধ করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

শ্রমিকদের এসব দাবি নিয়ে মালিকপক্ষের যদি কোনো আপত্তি থাকে, তা নিয়ে আলোচনা করে সমস্যার সমাধান করা যেত। মালিকপক্ষ যে সে পথ ধরেনি, সেটা স্পষ্ট। সাধারণভাবে আমাদের দেশের শ্রমিকদের যে বেতন, তাতে মাস চালানো কঠিন। তারপর মাসের মাঝামাঝি এসেও যদি আগের মাসের বেতন না পান, তাহলে তাঁরা কীভাবে চলবেন? ইফতার ও সাহ্‌রির সময় সব প্রতিষ্ঠানই শ্রমিকদের বিরতি দিয়ে থাকে। এ বিষয়ে বাঁশখালী কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষের একগুঁয়েমির কারণ কী?

শ্রমিকেরা বলেছেন, মালিকপক্ষ দাবি মেনে না নেওয়ায় তাঁরা শুক্রবার কাজে যাননি এবং ৪ নম্বর গেটের সামনে সমবেত হয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন। এ সময় কেন্দ্রের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ফাঁড়ির পুলিশ সদস্যরা সেখানে গেলে শ্রমিকেরা আরও ক্ষুব্ধ হন এবং তাঁদের দিকে ইটপাটকেল ছোড়েন। শ্রমিকদের ইটপাটকেলের জবাব দেয় পুলিশ গুলি ছুড়ে। এতে ৫ শ্রমিক নিহত ও প্রায় ৩০ জন আহত হন। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের শান্ত করতে কি গুলির কোনো বিকল্প ছিল না?

প্রথম আলোর প্রতিবেদক সরেজমিনে দেখতে পান, পাঁচ শ্রমিক গুলিতে নিহত হওয়ার পর অনেক শ্রমিক গ্রামে চলে গেছেন। শ্রমিকদের বিরুদ্ধে দুটি মামলা হয়েছে। একটি করেছে মালিকপক্ষ, আরেকটি পুলিশ। এতে সাড়ে তিন হাজার অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। ফলে যেসব শ্রমিক হত্যার প্রতিকার চাইবেন, তাঁরা গ্রেপ্তার–আতঙ্কে আছেন।

এ ঘটনায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে কী আসবে, আমরা জানি না। কিন্তু এটা জানা যে কোনো তদন্ত কিংবা ক্ষতিপূরণ নিহত শ্রমিকদের ফিরিয়ে দিতে পারবে না। এস আলম গ্রুপ কর্তৃপক্ষ নিহত শ্রমিকদের প্রত্যেককে ৩ লাখ এবং আহত ব্যক্তিদের ৫০ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণের ঘোষণা দিয়েছে। অর্থ দিয়ে মানুষ হত্যার ক্ষতিপূরণ হয় না। এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে যাতে না ঘটে, সে জন্য দরকার সংশ্লিষ্ট সবার জবাবদিহি ও শ্রমিক হত্যার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করা।

সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন