default-image

জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে রাজধানীতে অসংখ্য প্লট বাগিয়ে নেওয়ার দায়ে অভিযুক্ত ‘গোল্ডেন মনির’ একটি বিচ্ছিন্ন ভিলেন চরিত্র নন। অন্য ভিলেনরা এই সমাজব্যবস্থার মধ্যেই প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে লেপ্টে আছে। গোল্ডেন মনিরের অপকীর্তির বিষয়গুলো আমরা এমনভাবে জানছি, যাতে মনে হতে পারে, গোল্ডেন মনিরই নাটের গুরু। তিনিই সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং তার একশ্রেণির সাধু কর্মকর্তাকে কালিমালিপ্ত করেছেন। একজন প্রতিমন্ত্রীকে দেড় কোটি টাকা দামের গাড়ি উপহার দেওয়াটাই মারাত্মক খারাপ কাজ। গাড়ি নেওয়াটা ততটা খারাপ কাজ নয়। রাষ্ট্রের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ হলো, প্রকৃতপক্ষে এ ক্ষেত্রে দাতা নয়, গ্রহীতা মুখ্য, সেটাকে আইনি পাল্লায় তুলে দেওয়া। আমরা স্মরণ করতে পারি যে দুর্নীতির দায়ে ব্যবস্থা নেওয়ার পরপরই এই মন্ত্রণালয়ে রদবদল ঘটেছিল।

রাজউকে মনিরের আধিপত্যের সূচনা ঘটার পর দেশে সম্পূর্ণ ভিন্নমুখী তিন ধরনের সরকারব্যবস্থার অদলবদল ঘটেছে—বিএনপি, সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং আওয়ামী লীগ সরকার। আওয়ামী লীগ টানা প্রায় আড়াই মেয়াদ ইতিমধ্যে পার করল। এখন এসে অবৈধ অস্ত্র, মাদক ও বৈদেশিক মুদ্রা রাখার অভিযোগে তিনটি মামলা দায়ের এবং রিমান্ড মঞ্জুর হলো। এটা লক্ষণীয় যে মনির এবং তাঁর অপরাধকাণ্ডের সঙ্গে সরকারের অন্তত এক ডজন সংস্থা ও বিভাগ জড়িত, যাদের কারোর পক্ষেই তাঁর অবৈধ কর্মকে নির্দিষ্টভাবে চ্যালেঞ্জ জানানো সম্ভব হয়নি।

বিজ্ঞাপন

একটি গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টের ভিত্তিতে র‍্যাব মনিরকে গ্রেপ্তার করেছে। ভূমিদস্যুবৃত্তির মতো অপরাধ দমনে র‍্যাবের এগিয়ে আসার কথা ছিল না। সার্বিক বিবেচনায় বলা চলে, ঘটনাটি রাজউকে আইনের শাসনহীনতা, বিশৃঙ্খলা এবং নৈরাজ্য প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের নির্দেশক। এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। কেউ নিশ্চয় এমন হাস্যকর দাবি করবেন না যে গোল্ডেন মনির কেবল একাই ব্যক্তিগত দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে দুই শ প্লট বাগিয়ে নিয়েছেন, এগুলোর সিংহভাগই বাড্ডায়। এত বড় প্রমাণিত দলিলনির্ভর ‘ডাকাতির’ ঘটনায় মনিরের ‘সহযোগীরা’ কে কবে গ্রেপ্তার হচ্ছেন, সেটাই এখন কোটি টাকার প্রশ্ন।

র‍্যাব মুখপাত্রের কথায়, রাজউকের ‘বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক’ গড়েছিলেন মনির। সুতরাং জনগণ দেখতে চাইবে, মনির শুধু নন, সন্দেহভাজন ‘কর্মকর্তারা’ চিহ্নিত হয়েছেন এবং তাঁদের সবার বিচার শুরু হয়ে গেছে। গোল্ডেন মনির এই কর্মকর্তাদের সৃষ্টি। গোল্ডেন মনির তাঁদের সৃষ্টি করেননি এবং অবশ্যই তাঁরা শুধু একজন মনির সৃষ্টি করেননি। প্রশ্ন হলো, অবশিষ্ট মনিরদের বিরুদ্ধে কে কবে ব্যবস্থা নিতে দেখবে?

আমরা বরং আশঙ্কা করতে পারি যে রাজউকের দুর্নীতির ব্যাপকভিত্তিক কোনো তদন্ত হবে না। এক বছর আগে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের হস্তক্ষেপের পর তদন্ত হলে মনির আগেই ধরা পড়তেন। এখনো অবৈধ অস্ত্র, মাদক বা মুদ্রা রাখার মামলার বিচারকার্যে ‘দ্রুতগতি’ দর্শন হয়তো সম্ভব হবে। অথচ তুলনামূলক বিচারে রাজউককেন্দ্রিক জালিয়াতি এবং দুর্নীতির বিচার অগ্রাধিকার পাওয়ার দাবি রাখে এবং এটা মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে ভূমি নিয়ে রাজউককেন্দ্রিক যে দুর্নীতি মহিরুহে পরিণত হয়েছে, তাকে উপড়ে ফেলার রাজনৈতিক অঙ্গীকারের বিষয়টিই আজ সবচেয়ে জরুরি।

আমরা অবশ্যই দেরিতে হলেও গোল্ডেন মনিরের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু একই সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে এভাবে কিছুদিন পরপর বিচ্ছিন্নভাবে একটি বিশেষ চরিত্র হাজির করা হলে জনমনে তা নিয়ে কৌতূহল দেখা দেওয়া স্বাভাবিক। সরকারি প্রশাসনের পক্ষে দুর্নীতি ও সমাজবিরোধীদের বিরুদ্ধে আইনের ‘আপন গতি’ চলমান রাখার মতো একটি ভাবমূর্তি দরকারি। কিন্তু দুর্নীতির বিচারের নামে প্রহসন প্রতীয়মান হওয়া কাম্য নয়।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন