পরিকল্পনা হতে হবে টেকসই ও সমতাভিত্তিক

গ্রামে শহরের সুবিধা

বিজ্ঞাপন

সাম্প্রতিক কালে সরকারের নীতিনির্ধারকেরা গ্রামে শহরের সুবিধা দেওয়া হবে বলে গালভরা বুলি আওড়ালেও বাস্তবে তার প্রতিফলন খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। সরকারের সব কাজ ও পরিকল্পনা শহরকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয়, যা সুষম উন্নয়নের পরিপন্থী।

গত শনিবার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্লানার্স (বিআইপি) আয়োজিত আন্তর্জাতিক সম্মেলন উদ্বোধন করতে গিয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বলেছেন, গ্রামে শহরের সুবিধা দিতে পারলে ঢাকা শহরের ওপর চাপ কমবে। তাঁর এই বক্তব্যের সঙ্গে কেউ দ্বিমত করবে না। ঢাকা শহরের ওপর চাপ না কমলে এটি আরও বেশি বসবাসের অযোগ্য শহরে পরিণত হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, গ্রামে শহরের সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হলেও সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনায় তার প্রতিফলন কতটা থাকছে? গ্রামে শহরের সুবিধা মানে কিছু অবকাঠামো নির্মাণ নয়। সত্যিকার উন্নয়ন করতে হলে গ্রামাঞ্চলে কর্মসংস্থান এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

 সরকারের নীতিনির্ধারকেরা একদিকে গ্রামে শহরের সুবিধা দেওয়ার কথা বলছেন, অন্যদিকে ক্ষমতাকে কেন্দ্রায়িত করছেন। সংবিধানে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালী করার কথা থাকলেও এসব সংস্থাকে রাখা হয়েছে ঠুঁটো জগন্নাথ হিসেবে। অধিকাংশ পৌরসভা কর্মচারীদের বেতন-ভাতাই ঠিকমতো দিতে পারছে না, উন্নয়নকাজ কীভাবে করবে? আদর্শ পদ্ধতি হলো, যাদের জন্য উন্নয়ন তাদের মতামতের ভিত্তিতে পরিকল্পনা নেওয়া। কিন্তু আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনায় স্থানীয় মানুষের ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই। সবকিছু ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়। স্থানীয় সরকার সংস্থার পদাধিকারীদেরও অন্ধকারে রাখা হয়।

চলতি অর্থবছরের বাজেটেও আমরা দেখেছি, গুটিকয়েক বড় প্রকল্পের জন্য প্রচুর অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অথচ গ্রামাঞ্চলের জন্য বরাদ্দ ছিল খুবই কম। দ্বিতীয়ত, আমরা লক্ষ করছি সরকারের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যেও রয়েছে বিরাট ফারাক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৮ সালে গ্রাম থেকে শহরে আসছে নমুনা এলাকার প্রতি হাজারে ৩০ দশমিক ৬ জন মানুষ। ২০১৭ সালে প্রতি এক হাজারে ৩০ দশমিক ৩ জন মানুষ শহরে আসত। ২০১৬ সালে গ্রাম ছেড়ে শহরে আসত ৩০ দশমিক ৩ জন, ২০১৫ সালের জরিপে ছিল ২৯ দশমিক ৫ জন এবং ২০১৪ সালে আসত ২৮ দশমিক ২ জন। ২০১৩ সালে ছিল ২৭ দশমিক ২ জন। ২০১২ সালে ছিল ২৬ দশমিক ২ জন এবং ২০১১ সালে ছিল ২৩ দশমিক ৭ জন। এভাবে প্রতিবছর অধিক হারে গ্রামের মানুষ শহরে এলেও এর প্রতিকারে সরকার কোনো কর্মসূচি নিয়েছে, এমন দৃষ্টান্ত নেই। সরকার শহরের ওপর জনসংখ্যার চাপ কমানোর কথা বলছে। কিন্তু বাস্তবে সেই চাপ উত্তরোত্তর বেড়ে চলেছে, যা এখন অনেকটা অসহনীয় পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। এর অন্যতম কারণ, ঢাকার বাইরে জীবিকার সুযোগ নেই। নদীভাঙন, বন্যা, খরা ইত্যাদির কারণে গ্রাম থেকে বাস্তুচ্যুত ও জীবিকাচ্যুত হয়ে তারা শহরে আশ্রয় নিচ্ছে।

সরকার গ্রামে জনগণকে আকৃষ্ট করতে কর্মসংস্থান বাড়ানো, চর জীবিকায়ন প্রকল্প, ঘরে ফেরা কর্মসূচি, গৃহায়ণ প্রকল্প, ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প নিয়েছে। এসব ভালো উদ্যোগ হলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা খুবই কম এবং বেশির ভাগ প্রকল্প নেওয়া হয় অস্থায়ী ভিত্তিতে। মন্ত্রী ১০০ বছরের প্রয়োজনীয়তা সামনে রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু সড়ক-মহাসড়ক থেকে শুরু করে সরকার যেসব অবকাঠামো তৈরি করছে, তার বেশির ভাগই অস্থায়ী। কোনো কোনো অবকাঠামো পাঁচ–দশ বছরের মধ্যে অকেজো হয়ে পড়ে।

অতএব, গ্রামে শহরের সুবিধা দেওয়ার আগে সমতাভিত্তিক উন্নয়নের ওপর জোর দিতে হবে। আমরা টেকসই উন্নয়ন চাই, যার সুবিধা কমবেশি সবাই পাবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন