বিজ্ঞাপন

এর আগে সিডর, আইলা ও আম্পান উপকূলের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আঘাত হানলেও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল অনেকটা অক্ষত ছিল। এবার জোয়ারের পানিতে উপকূলের সব জেলা কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনের বাঁধ, সড়ক ও ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। ১০ হাজার জন-অধ্যুষিত দ্বীপটির অর্ধেকের বেশি মানুষ আশ্রয়চ্যুত হয়েছে। জোয়ারের পানিতে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার উপকূল প্লাবিত হয়েছে।

ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ নিয়মিত ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতের শিকার হয়। এর সঙ্গেই যেহেতু আমাদের বসবাস করতে হবে, তাই ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় টেকসই পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রতিমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন, ষাটের দশকে নির্মিত উপকূলীয় রক্ষা বাঁধ এখন অকেজো হয়ে পড়েছে। কিন্তু সেই অকেজো বাঁধকে কেজো করার উদ্যোগটি নেবে কে?

এটা দুর্ভাগ্যজনক যে আইলা ও সিডরের সময় ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধও এখন পর্যন্ত মেরামত করা সম্ভব হয়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ড সব সময় মুখস্থ কথা বলে যাচ্ছে যে মন্ত্রণালয়ে প্রকল্পের কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। অনুমোদন পেলেই তারা কাজ শুরু করতে পারবে। অথচ এসব বাঁধ নিয়ে নিকট অতীতে পানি উন্নয়ন বোর্ড কোনো জরিপও করেনি। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, উপকূলে ছয় হাজার কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে, তার বেশির ভাগই ক্ষতিগ্রস্ত ও জীর্ণ। এ ছাড়া নতুন দ্বীপগুলোতে বাঁধ না থাকায় সহজে জোয়ারের পানি ঢুকে ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট বিধ্বস্ত করে, গাছপালা-শস্যখেত ডুবিয়ে দেয়।

ঘূর্ণিঝড় থেকে উপকূলকে রক্ষার ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক প্রাচীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমাদের দেশে সুন্দরবন একটি অংশকে রক্ষার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করে আসছে। এর বাইরের পথটি হচ্ছে মানবসৃষ্ট প্রাচীরের সুরক্ষা। উপকূলজুড়ে সবুজ বেষ্টনী তৈরিও একটি কার্যকর পথ। ভোলাসহ বিভিন্ন স্থানে সবুজ বেষ্টনী তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে পুরো উপকূলকে বিবেচনায় নিয়ে কোনো পরিকল্পনা এবং সে অনুযায়ী কিছু না হওয়ায় উপকূল অরক্ষিত অবস্থায় রয়ে গেছে। এবার ঘূর্ণিঝড় ইয়াস বাংলাদেশে আঘাত করেনি, সেটা আমাদের জন্য স্বস্তির। কিন্তু এই ঘূর্ণিঝড়কে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে দরকারি উদ্যোগ না নিলে সামনে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি থেকে যাবে।

উপকূলের বাঁধ নিয়ে ‘সংস্কার সংস্কার খেলা’ বন্ধ করে বর্তমান উঁচু জোয়ারের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বাঁধ তৈরি করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রে উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার কারণে সামনে ঘন ঘন ও বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কা বাড়ছে। জলোচ্ছ্বাসগুলোও আগের চেয়ে উঁচু হবে। একই সঙ্গে সুন্দরবনের মতো প্রাকৃতিক প্রাচীরকে সংরক্ষণ ও রক্ষার উদ্যোগ নিতে হবে। সুন্দরবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, এ রকম প্রকল্প ও উন্নয়ন কর্মসূচি থেকে বিরত থাকতে হবে।

সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন