default-image

এক দিন আগেও নির্বাচন কমিশন (ইসি) ঘোষণা দিয়েছিল, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন উৎসবমুখর পরিবেশে হবে। এক দিন পর ভোটকেন্দ্রে জবরদস্তি, সংঘর্ষ, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া এবং প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে একজন মানুষের মৃত্যু ও বহু লোক আহত হওয়ার মধ্য দিয়ে সেই নির্বাচন শেষ হলো। এর আগে নির্বাচনী প্রচারকালেও দুজন নিহত হয়েছেন প্রতিপক্ষের আক্রমণে। কেন এমনটি হলো, প্রত্যেক গণতন্ত্রমনস্ক মানুষের মনে এ প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

প্রচারণা থেকে শুরু করে ভোট গ্রহণ পর্যন্ত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রতিটি স্তরে অনিয়ম ও জবরদস্তি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে আসতে বাধার শিকার হয়েছেন। নানা বাধা পেরিয়ে যাঁরা কেন্দ্রে এসেছেন, তাঁদের সবাই ভোট দিতে পারেননি। ভোটকেন্দ্র থেকে বিরোধী দলের নির্বাচনী এজেন্টকে বের করে দেওয়া এবং বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে তাঁদের ধরপাকড় করার গুরুতর অভিযোগ থাকলেও ইসি কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ১৯ লাখ ভোটার-অধ্যুষিত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে ভোট দিয়েছেন মাত্র চার লাখের কিছু বেশি মানুষ। শতকরা হিসাবে ২২ দশমিক ৫০ শতাংশ। মেয়র পদে আওয়ামী লীগের বিজয়ী প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরী পেয়েছেন ৩ লাখ ৬২ হাজার ৬৯৪ আর বিএনপির প্রার্থী শাহাদাত হোসেন পেয়েছেন ৫২ হাজার ৪৮৯ ভোট। অথচ ২০১৫ সালের নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জয়ী হলেও বিএনপির প্রার্থী পেয়েছিলেন ৩ লাখ ৪ হাজার ভোট।

বিজ্ঞাপন

যে নির্বাচন নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী দল, প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও উৎসাহ ছিল, সেই নির্বাচনে এত কম ভোট পড়ার কারণ কী? বরাবরের মতো নির্বাচন কমিশন চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনেও ‘সবকিছু ঠিক আছে’ বলে গরম আওয়াজ দিলেও নির্বাচনের ন্যূনতম পরিবেশ তৈরি করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। নির্বাচনে কোন দলের মেয়রপ্রার্থী কিংবা কোন দলের কতজন কাউন্সিলর প্রার্থী জয়ী হয়েছেন, এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পেরেছেন কি না। নির্বাচনে যেসব দল ও প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, তাঁরা নির্বাচনী আইন মেনে চলছেন কি না, তা দেখার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। যাঁরা নির্বাচনী আইন লঙ্ঘন করেছেন, ইসির উচিত ছিল তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। কিন্তু ইসি তা না নিয়ে আইন ভঙ্গকারীদের উৎসাহিত করেছে। ফলে এ নির্বাচনের অঘটনের দায়ও তাদের নিতে হবে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৪১টি ওয়ার্ডের মধ্যে কাউন্সিলর পদে ৩৯টিতে বুধবার ভোট হয়েছে। একটিতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগ প্রার্থী জয়ী হয়েছেন এবং প্রার্থী মারা যাওয়ায় বাকি একটিতে ভোট হয়নি। উল্লিখিত ৩৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে আওয়ামী লীগ-মনোনীত প্রার্থী ৩২টিতে এবং দলের বিদ্রোহী প্রার্থী ৭টিতে জয়ী হয়েছেন। কিন্তু বিএনপি–সমর্থিত কোনো প্রার্থী জয়ী হননি। ভোটের এ আসমান–জমিন ফারাক কি আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তার ঊর্ধ্বসূচক না অন্য কিছু, তা অনুসন্ধান জরুরি। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে অনুষ্ঠিত গত পাঁচটি নির্বাচনের চারটিতেই বিরোধী দলের প্রার্থী জয়ী হয়েছিলেন।

আবারও প্রমাণিত হলো, নির্বাচন মোটামুটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে কমিশনের যে সততা ও সক্ষমতা দরকার, কে এম নূরুল হুদা কমিশনের তা নেই। এ কমিশন যত দিন থাকবে, তত দিন জনগণের ভোটাধিকার সুরক্ষিত হবে না। এর জন্য কে এম নূরুল হুদা কমিশনকে ভবিষ্যতে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াতেই হবে।

সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন