খাদ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, সরকারি গুদামে প্রচুর চাল আছে, ভয় পাওয়ার কারণ নেই। কৃষি মন্ত্রণালয়ের দাবি, দেশে পর্যাপ্ত ধান উৎপাদিত হয়েছে, আমদানির প্রয়োজন নেই। তাহলে কেন ভরা মৌসুমে চালের দাম বাড়ছে। আর মোটা চালের দামই বেশি বেড়েছে, যা গরিব ও স্বল্প আয়ের মানুষ খেয়ে থাকে। এমনিতেই তাঁদের আয়রোজগার কম। করোনাকালে আয় আরও কমে গেছে। এ অবস্থায় চালের অব্যাহত মূল্যবৃদ্ধি মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে এই বিরাট জনগোষ্ঠীকে।

প্রশ্ন হলো উত্তরণের উপায় কী। এ ব্যাপারে কৃষি মন্ত্রণালয় ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় আছে বলেও মনে হয় না। খাদ্য মন্ত্রণালয় আপৎকালীন সংকট উত্তরণে চাল আমদানির ওপর জোর দিয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের মতে, এই মুহূর্তে চাল আমদানির প্রয়োজন নেই। চালকলমালিক ও আড়তদারদের হাতে যে চাল আছে, সেটি বাজারে আনতে পারলেই দাম কমে যাবে।

গতকাল সোমবার প্রথম আলোর প্রতিবেদনে চালের মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে তিনটি বিষয়ের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। প্রথমত,
সময়সীমা বাড়ানোর পরও সরকার ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি। লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল আট লাখ মেট্রিক টন। তারা সংগ্রহ করেছে মাত্র পাঁচ লাখ টন। সরকারি গুদামে চাল আছে সোয়া ১১ লাখ মেট্রিক টন, যার মধ্যে আগের মজুত ৩ লাখ টনও আছে। এই মজুতকে স্বস্তিদায়ক বলা যায় না।

বিজ্ঞাপন

বরাবরের মতো এবারও সরকার কৃষকের কাছ থেকে ধান না কিনে চালকলমালিকের ওপরই বেশি নির্ভর করেছে। কিন্তু চালকলমালিকেরা এখন সরকার নির্ধারিত দামে চাল দিচ্ছেন না। তঁারা প্রথমে প্রতি কেজি দুই টাকা এবং পরে চার টাকা বেশি দাবি করেছেন। খাদ্য মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে সিদ্ধান্তে না আসতে পারায় একধরনের অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে। চলতি বছর ধানের দাম বাড়তির দিকে থাকায় সচ্ছল কৃষকেরাও বেশি পরিমাণ ধান মজুত রেখেছেন।

কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার অধিকার আছে। অন্যদিকে স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে কম দামে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছানোর দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে। কেবল উৎপাদন কম হলেই দেশে খাদ্যসংকট হয় না; সেটি মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে থাকলেও ঝুঁকি বাড়ায়। স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিতে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দুটি কর্মসূচি হলো যথাক্রমে খোলাবাজারে চাল বিক্রি (ওএমএস) এবং ১০ টাকা কেজি চাল বিক্রি। খোলাবাজারে চাল বিক্রি বন্ধ আছে। ১০ টাকা কেজির চাল বিক্রির উদ্যোগ নিয়েও কর্তৃপক্ষ সমালোচনার মুখে বন্ধ করে দেয়। করোনাকালে সরকার যে খাদ্যসহায়তা দিয়েছে, তার সুবিধা গরিব মানুষের একাংশ পেলেও বিরাট জনগোষ্ঠী বাইরেই থেকে গেছে। এই অবস্থায় মোটা চালের দাম ৩০-৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। একদিকে আয় কমে যাওয়া, অন্যদিকে চালের দাম বেড়ে যাওয়ায় স্বল্প আয়ের মানুষ চরম সংকটে আছেন।

এ অবস্থায় সরকারের প্রথম করণীয় চালের মজুত বাড়ানো। সরকারি গুদামের বাইরে দেশে কত ধান-চাল মজুত আছে, সে সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য সরকারের কাছে না থাকায় চালকলমালিকদের কথাই সত্য বলে মেনে নিতে হচ্ছে তাকে। বন্যা ও আম্পানের কারণে আমন ও আউশ চাষ ব্যাহত হয়েছে। আগামী বোরো মৌসুমের বাকি ছয়-সাত মাস। অতএব, কোনো রকম ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। চালের মজুত বাড়ানোর পাশাপাশি চাল বিতরণ কর্মসূচি জোরদার করতেই হবে। তাতে স্বল্প আয়ের মানুষের কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হবে।

মন্তব্য পড়ুন 0