default-image

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) যে ৯টি দেশকে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সম্পর্কে সতর্ক করেছে, সেগুলোর মধ্যে বাংলাদেশও আছে। সংস্থাটি গত বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেছে, গত এক বছরে বাংলাদেশের প্রধান খাদ্য চালের দাম ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৭ সালের অক্টোবরের পর এ দেশে এটাই চালের দাম বাড়ার সর্বোচ্চ হার। এর কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে চালের উৎপাদন ঘাটতি, সীমিত আমদানি এবং কোভিড-১৯ মহামারির কারণে চালের চাহিদা বৃদ্ধি।

আমনের ভরা মৌসুমে চালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সম্পর্কে আমরা ইতিমধ্যে একাধিক সংবাদ প্রতিবেদন, সম্পাদকীয় নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ইত্যাদি প্রকাশ করেছি। সব লেখাতেই যে প্রধান সমস্যার কথা গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে তা হলো, সরকারি গুদামে ধান ও চালের মজুত অস্বাভাবিক মাত্রায় কমে যাওয়া। দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সরকারি গুদামে মজুত ১০ লাখ টনের নিচে নামলেই বাজারে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং চালের দাম বাড়তে শুরু করে। মজুত যত কমতে থাকে, দাম তত বাড়তে থাকে। সে কারণে আমরা শুরু থেকেই গুরুত্বের সঙ্গে তাগিদ দিয়ে এসেছি সরকারি গুদামে চালের মজুত বাড়ানো প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তেমন কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। আমন ফসল ওঠার পরও সরকারি গুদামে মজুত সাড়ে পাঁচ লাখ টনের ওপর ওঠেনি। অথচ ওয়াকিবহাল মহল ও বিশেষজ্ঞরা সব সময়ই বলেন, সরকারি গুদামে মজুত ১৫ লাখ টন থাকলে ভালো হয়; কিন্তু ১২ লাখ টনের নিচে কখনোই নামা উচিত নয়।

বিজ্ঞাপন

চালের বাজারে সরবরাহ বাড়লে দাম কমতে পারে—এ প্রত্যাশায় চাল আমদানি উৎসাহিত করার জন্য আমদানি শুল্ক কমিয়ে ৬২ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশে নামানো হয়েছে এবং সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় দেড় লাখ টন চাল ইতিমধ্যে আমদানি করা হয়েছে। কিন্তু তার এক মাস পরও বাজারে চালের দাম কমেনি। কারণ, বলা হচ্ছে আমদানি করা চালের দামও বেশি পড়ে যাচ্ছে। আমাদের অধিকাংশ চাল আমদানি হয় ভারত থেকে। বাংলাদেশ সরকার চালের আমদানি শুল্ক কমিয়েছে—এ খবরে ভারতের বাজারে চালের দাম বেড়েছে। ফলে আমাদের আমদানিকারকদের ভারত থেকে চাল আমদানি করতে খরচ তাঁদের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি পড়ে যাচ্ছে। এটি একটি সমস্যাই বটে। কারণ, এমন পরিস্থিতিতে আমাদের চাল ব্যবসায়ীরা আমদানিতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন। তা যদি হয়, তাহলে প্রত্যাশিত পরিমাণে চাল আমদানি হবে না এবং আমাদের বাজারে চালের দাম কমবে না।

তবে এপ্রিলের শুরুর দিকে হাওরাঞ্চলে এবং তারপর দেশের অন্যান্য অঞ্চলে বোরো মৌসুমের ধান উঠতে শুরু করলে অবশ্যই চালের বাজারে স্বস্তি ফিরে আসবে। উৎপাদন বেশি হলে চালের দাম কমে গিয়ে বরং ধানচাষিদের জন্য লোকসানি পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটতে পারে। এদিকেও লক্ষ রাখা প্রয়োজন, বাম্পার ফসল ফলিয়ে ধানচাষিদের যেন অস্বাভাবিক কম দামে ধান বিক্রি করতে না হয়। তবে সে সময় পর্যন্ত সরকারের উচিত গুরুত্বের সঙ্গে দুটো পদক্ষেপের কথা ভেবে দেখা। এক. সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্যসহায়তা বাড়ানো। দুই. চালের বাজারে মিলমালিকদের প্রায় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ থেকে ন্যূনতম রক্ষাকবচ হিসেবে সরকারি গুদামে চালের মজুত বাড়িয়ে অন্তত ১২ লাখ টনে উন্নীত করা।

সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন