default-image

বাংলাদেশে জ্বালানি হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রতিবছর গ্যাস থেকে অসংখ্য অগ্নিকাণ্ড ঘটছে; অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে, অনেক সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। একসঙ্গে অনেক মানুষের মৃত্যু ঘটেছে এমন কয়েকটি বড় অগ্নিকাণ্ডের প্রাথমিক উৎস ছিল জ্বালানি গ্যাসের সিলিন্ডার কিংবা তিতাস কোম্পানির গ্যাসের সরবরাহ লাইনের বিস্ফোরণ। দৃষ্টান্ত হিসেবে স্মরণ করা যেতে পারে ২০১০ সালে পুরান ঢাকার নিমতলীতে ১২৪ জন, ২০১৯ সালে চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ৭১ জন এবং সর্বশেষ গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে নারায়ণগঞ্জের একটি মসজিদে ৩৭ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা। এ রকম বড় আকারের ট্র্যাজিক অগ্নিকাণ্ড ছাড়াও গ্যাসের কারণে সারা বছরই কোনো না কোনো এলাকায় আগুন লাগে, তাতে মানুষ মারা যায়, কিংবা মারা না গেলেও মারাত্মকভাবে অগ্নিদগ্ধ হয় এবং সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি ঘটে। কিন্তু এই সমস্যা সমাধানের বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষদের তেমন উদ্যোগ নেই।

গত সোমবার প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষের সূত্রে লেখা হয়েছে, গত বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত শুধু নারায়ণগঞ্জ জেলাতেই ৯৪টি বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে, যেগুলোর উৎস ছিল জ্বালানি গ্যাস। ওই সব অগ্নিকাণ্ড মোট ৪৪ জনের মৃত্যুর হিসাব পাওয়া গেছে। শুধু একটি ঘটনাতেই মারা গেছেন ৩৭ জন; দগ্ধ হয়েছেন আরও ৩ জন। সেটি ছিল গত ৪ সেপ্টেম্বর বাইতুস সালাত জামে মসজিদে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড। তিতাস গ্যাস কোম্পানির পাইপলাইনে ছিদ্র থেকে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিল বলে ধারণা করা হয়। তারপর তিতাসের ফতুল্লা অঞ্চলের চার কর্মকর্তাসহ আটজনকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছিল, কিন্তু অচিরেই তাঁদের চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয়েছে। তিতাসের নারায়ণগঞ্জ কার্যালয় থেকে প্রথম আলোকে বলা হয়েছে, সেখানকার অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি করা হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, তিতাসের কর্মীদের অবহেলার প্রমাণ রয়েছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ২৯ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র পেশ করেছে।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিশন ভবিষ্যতে এ ধরনের বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড এড়াতে যে ১৮ দফা সুপারিশ করেছিল, সেগুলোর কোনোটাই বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। নারায়ণগঞ্জের তিতাস কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে যে তাদের এখতিয়ারভুক্ত এলাকায় গ্যাসের অনেক পুরোনো পাইপলাইন আছে, সেগুলোতে ছিদ্র থাকতে পারে। কিন্তু সেসব ছিদ্র বন্ধ করার কিংবা জীর্ণ-পুরোনো পাইপলাইনগুলো প্রতিস্থাপনের নিয়মিত কোনো ব্যবস্থা নেই। বলা হয়েছে, লিকেজের খবর পেলে তা দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু এই বক্তব্যও যে সত্য নয়, তার একটি প্রমাণ বাইতুস সালাত জামে মসজিদের বিস্ফোরণ। কারণ, ওই এলাকার বাসিন্দারা বিস্ফোরণের আগে দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসের গন্ধ পেতেন, তাঁরা একাধিকবার সে কথা তিতাস কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু তিতাস কর্তৃপক্ষ তাঁদের আবেদনে ভ্রুক্ষেপ করেনি। বিস্ফোরণে ৩৭ জন মারা যাওয়ার পর সংবাদমাধ্যমে তোলপাড় শুরু হওয়ার পরেই শুধু তাদের টনক নড়ে।

শুধু নারায়ণগঞ্জ নয়, আরও অনেক এলাকায় তিতাসের গ্যাসের পাইপলাইনগুলো এমন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় চলছে। আবারও কোথাও বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড ঘটার আগেই তিতাস কর্তৃপক্ষের উচিত, তাদের সব এলাকার পুরোনো সব পাইপলাইনের ছিদ্র বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া।

সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন