তিতাসের গ্যাসলাইন

ঝুঁকি দূর করার উদ্যোগ নিন

বিজ্ঞাপন

তিতাস গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানি লিমিটেডের অবস্থা হয়েছে ‘সর্বাঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দেব কোথা’। সরকারের অন্যান্য সেবাদানকারী সংস্থার অবস্থাও ভালো নয়। দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা সর্বত্র। তিতাস গ্যাসের ক্ষেত্রে বিপজ্জনক হলো এর গ্যাসলাইন থেকে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তার পরিণতি হয় মারাত্মক। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের পশ্চিম তল্লার বাইতুস সালাত জামে মসজিদে বিস্ফোরণে ২৮ জন মানুষ মারা গেছেন, যাঁরা সেখানে গিয়েছিলেন নামাজ পড়তে। প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, পার্শ্ববর্তী গ্যাসলাইনের ছিদ্র থেকেই গ্যাস নির্গত হওয়ার ফলে মসজিদে বিস্ফোরণ ঘটে। গত এক বছরে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বহু স্থানে গ্যাসলাইন থেকে বহু প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো, তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ এর প্রতিকারে কার্যকর ও টেকসই কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

নারায়ণগঞ্জের ঘটনায় তিতাস গ্যাস কোম্পানি দায়িত্বে অবহেলার দায়ে চার কর্মকর্তাসহ আটজনকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে। এখানে লাইনের কারিগরি ত্রুটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তিতাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতি। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এক মাসের বেশি সময় ধরে লাইনের ছিদ্র থেকে গ্যাস বের হচ্ছিল। বৃষ্টির পর গ্যাসের বুদ্‌বুদ দেখা যেত। মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে বিষয়টি তিতাসের ফতুল্লা অফিসে জানানো হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মেরামতের জন্য ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন। মসজিদ কমিটি ঘুষ দেয়নি বলে লাইন মেরামতকাজও আটকে ছিল। তিতাসের এই আচরণের ব্যাখ্যা কী? এ ক্ষেত্রে মসজিদ কমিটিরও কিছুটা দায় ছিল। মৌখিক অভিযোগ করেই তারা নিশ্চুপ ছিল; কেন লিখিত অভিযোগ করেনি?

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর চুরি-দুর্নীতি আর গোপন বিষয় নয়। গ্রাহকেরা নিয়ম মেনে চললে কিংবা ঠিকমতো সেবা মাশুল দিলেও সেবা পান না। সেবা পেতে হলে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের উৎকোচ দিতে হয়। এতে এসব প্রতিষ্ঠানের অসাধু কর্মকর্তাদের পকেট ভারী হলেও রাষ্ট্র ও জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

নারায়ণগঞ্জের মসজিদে বিস্ফোরণে এতগুলো মানুষ মারা যাওয়ার পর তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন স্থানে অভিযান শুরু করেছে। এর আগেও দেখা গেছে, কোথাও দুর্ঘটনা ঘটার পর কিছুদিন অভিযান ও মেরামতের কাজ চলে। কিছু অবৈধ গ্যাস–সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। তারপর সবকিছু আবার আগের নিয়মে চলতে থাকে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, তিতাসের গ্যাসলাইনগুলো এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ যে সেগুলো যেন টাইম বোমার শামিল। যেকোনো সময় আরও ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। গ্যাসলাইন দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে তাঁরা পুরোনো লাইন, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও অবৈধ গ্যাস–সংযোগকে দায়ী করেছেন।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে পাইপলাইনের সাহায্যে গ্যাস সরবরাহের মাধ্যমে ১৯৬০ সালে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ শুরু হয়। বাসাবাড়িতে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয় ১৯৬৭ সালের দিকে। বর্তমানে দেশে ২৪ হাজার ২৮৭ কিলোমিটার গ্যাসলাইন আছে, যার ৭০ শতাংশই ত্রুটি ও ঝুঁকিপূর্ণ। গ্যাসলাইন রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে যাঁরা নিয়োজিত, তাঁদের খামখেয়ালি ও স্বেচ্ছাচারিতার কাছে গ্রাহকেরা জিম্মি হয়ে আছেন। গ্যাসলাইন মেরামত নয়, তিতাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উৎসাহ থাকে অবৈধ গ্যাস–সংযোগের দিকে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

গ্যাসলাইন নিয়ে যে টাইম বোমার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা থেকে রেহাই পেতে হলে বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্ন কোনো পদক্ষেপ নিলে কাজ হবে না। তিতাস গ্যাস কোম্পানিকে একটি মহাকর্মপরিকল্পনা নিতে হবে। পুরোনো গ্যাসলাইনগুলো মেরামত করে ত্রুটিবিচ্যুতি দূর করতে হবে, যেন দুর্ঘটনার ঝুঁকি না থাকে। প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পাশাপাশি তিতাসের সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা একান্ত জরুরি। তিতাস বলছে, তারা একটি কর্মপরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেলে সেটি একনেকে যাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য। আসলে প্রয়োজন কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং গ্যাসলাইনগুলোর শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন