পুলিশ ও পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার আগে জাহিদুলকে টেলিফোনে হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। তিনি বা তাঁর স্ত্রী ও স্থানীয় কাউন্সিলর ফারহানা বিষয়টি কেন পুলিশকে জানাননি, সেই প্রশ্নও না উঠে পারে না। কোনো কোনো সূত্রমতে, এ হত্যার সঙ্গে ২০১৯ সালের ক্যাসিনো–কাণ্ড ও ২০১৩ সালের ২৯ জুলাই ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজুল হক খান মিল্কি হত্যার যোগসূত্র থাকতে পারে। দুবাইয়ে পলাতক অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী জিশানের নির্দেশেই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে পত্রিকার খবরে বলা হয়। সন্ত্রাসী জিশানের সঙ্গে ভারতে পলাতক ফ্রিডম মানিকের যোগসাজশ আছে বলে জানা গেছে।

তাই জাহিদুল ইসলাম হত্যার ঘটনাটি নিছক একটি খুন নয়, ভূতল অপরাধজগতের দুর্বৃত্তায়ন ও জিঘাংসার একটি উদাহরণ মাত্র। ২০১৬ সালে মতিঝিল এলাকার যুবলীগ নেতা রিজভী হাসান ওরফে বোঁচা বাবু খুন হন। এই বোঁচা বাবু ছিলেন জাহিদুলের ঘনিষ্ঠ। বোঁচা বাবু হত্যার অন্যতম আসামি ওমর ফারুক, যিনি স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাও; সম্প্রতি মামলা থেকে তাঁর নাম বাদ দেওয়ার উদ্যোগ নিলে জাহিদুল বাদ সাধেন। এরপরই অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তি টেলিফোন থেকে তাঁকে হত্যার হুমকি দেয়।

স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার ও টেন্ডারবাজি নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের অন্তর্দ্বন্দ্বে একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটছে, অথচ সরকার কিংবা ক্ষমতাসীন দল নিশ্চুপ। যে শিক্ষার্থী রিকশায় বান্ধবীকে নিয়ে ঘরে ফিরছিলেন, তাঁকে কেন বেঘোরে সন্ত্রাসীদের হাতে জীবন দিতে হলো? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, জাহিদুল ও সামিয়ার হত্যাকারী যে–ই হোক, বিচার হবে। কিন্তু সেই বিচার যে খুনের মহড়া থামাতে পারবে, তার নিশ্চয়তা কী? টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ও দখলবাজি রহিত করা না হলে এ রকম আরও খুন ঘটতে থাকবে।

নিহত কলেজশিক্ষার্থী সামিয়ার মা–বাবা বলেছেন, ‘কার শাস্তি চাইব। বিচার কার কাছে চাইব।’ তাঁদের এ বক্তব্যে কেবল সরকার নয়, রাষ্ট্রের প্রতিও অনাস্থা প্রকাশ পেয়েছে। সামিয়ার বাবা জামালউদ্দিন মিরপুরের কারখানায় কাজ করেন। তিন রুমের বাসার একটি রুম সাবলেট দিয়ে অতি কষ্টে সংসার চালাচ্ছিলেন। মা হোসনে আরা সেলাই করে ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচ জোগাড় করছিলেন। আসামির গ্রেপ্তার কিংবা হত্যার বিচার তাঁদের কী সান্ত্বনা দেবে?

আমরা মনে করি, তারপরও অপরাধের বিচার করতে হবে। বিচারহীনতার কারণেই ভূতল অপরাধী চক্র গড়ে ওঠে, বিদেশে পলাতক থেকেও সন্ত্রাসীরা খুনের হুকুম দিতে পারে। যে বাজারের দখল নিয়ে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ নেতাদের দ্বন্দ্ব, বিএনপি আমলে সেই বাজার ছিল বিএনপির এক নেতার দখলে। এখন আওয়ামী লীগ নেতার দখলে। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর দখলবাজি বন্ধ হয় না, দখলদারদের চেহারা বদল হয়।

আমরা জাহিদুল হত্যার বিচার চাই। অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই। সেই সঙ্গে যে টেন্ডারবাজি ও দখলবাজির কারণে খুনোখুনি হয়, তা চিরতরে বন্ধ করতে হবে।

সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন