প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার জনপ্রতিনিধির মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণে অনিয়ম ও দুর্নীতির দায়ে মাত্র ১০৮ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করেছিল স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। বমাল ধরা পড়ায় তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে কারাগারেও যেতে হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবে জনমনে আশা জেগেছিল, এবার স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় কিছুটা হলেও শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি ফিরে আসবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই আশার গুড়ে বালি পড়তে দেরি হলো না।

প্রথম আলোর খবর থেকে জানা যায়, স্থানীয় সরকার বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সাময়িক বরখাস্ত হওয়া ১০৮ জনপ্রতিনিধির মধ্যে ২৫ জন আদালতের স্থগিতাদেশ দেখিয়ে পদে ফিরেছেন। আরও কয়েকজন ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন। স্থানীয় সরকার বিভাগের ভাষ্য, আইনের ফাঁকফোকর গলে অনেকেই স্থগিতাদেশ আনছেন। এসব আদেশের বিরুদ্ধে তাঁরা আপিল করবেন বলেও জানিয়েছেন।

স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসে, তাহলে কি করোনাকালে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ শতভাগ শুদ্ধ ছিল? তথ্যপ্রমাণ তা বলে না। অনেকে বমাল ধরা পড়েছেন। ত্রাণসামগ্রী নিতে আসা অসহায় মানুষ কথিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে নিগৃহীত হয়েছেন। অনেক জনপ্রতিনিধি ত্রাণসামগ্রী খোলাবাজারে বিক্রি করেছেন, এ রকম তথ্যও পাওয়া গেছে। এত সবের পরও অভিযুক্ত জনপ্রতিনিধিদের স্বপদে ফিরে আসার রহস্যটা কী। রহস্য হলো মামলার কাঠামোগত দুর্বলতা। মামলাটি এমনভাবে সাজানো হয়, যাতে অভিযুক্ত সহজে পার পেয়ে যান। অভিযোগ প্রমাণ করতে হয় তথ্যপ্রমাণ ও সাক্ষ্য দিয়ে। এর কোনো স্তরে দুর্বলতা বা তথ্যে ঘাটতি থাকলে মামলা টিকবে না এবং অভিযুক্ত বেকসুর খালাস পাবেন।

বিজ্ঞাপন

যেসব জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তাঁদের ৯০ শতাংশ ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনও তাঁদের সঙ্গে আপসরফা করে চলে। শুরু থেকে স্থানীয় সরকারব্যবস্থাটি নির্দলীয় ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার দলীয়ভাবে নির্বাচন করায় এর স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এখন স্থানীয় সরকার সংস্থার জনপ্রতিনিধি ও ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে ফারাক করা কঠিন। দুজনে দুজনার। এ অবস্থায় স্থানীয় সরকার সংস্থার কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আশা করা যায় না।

করোনাকালেও ত্রাণসামগ্রী বিতরণ কিংবা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন নিয়ে বহু অভিযোগ এসেছে গণমাধ্যমে। সরকার ব্যবস্থা নিয়েছে গুটিকয়েক বিরুদ্ধে। এখন যদি উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে বা অন্য কোনো পথে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া জনপ্রতিনিধিরা একের পর এক স্বপদে ফিরে আসেন, তাহলে স্থানীয় সরকার সংস্থাকে জবাবদিহির আওতায় আনা কেবল কঠিন নয়, অসম্ভব হয়ে পড়বে। যদি দুর্নীতি-অনিয়মই না হবে, তাহলে ৫০ লাখ লোকের জন্য নেওয়া সরকারের বিশেষ সহায়তা কর্মসূচি থেকে ১৬ লাখ মানুষ বাদ পড়ল কেন?

অতীতে ক্ষমতায় যে দলই থাকুক না কেন, স্থানীয় সরকার সংস্থায় ভারসাম্য থাকত। স্থানীয় সরকার সংস্থায় দলীয়ভাবে নির্বাচন করায় সেটি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। নির্দলীয় স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা জরুরি। সরকার জনগণের জন্য যে সহায়তা কর্মসূচি নেয় এবং যেসব উন্নয়নকাজ করে, তাতে ন্যূনতম স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতাসীন দল ও জনপ্রতিনিধিদের একাকার করা যাবে না। আদর্শ ব্যবস্থা হলো জনপ্রতিনিধি হওয়ার পর তিনি দলীয় কোনো পদে থাকবেন না। সেটি সম্ভব না হলেও স্থানীয় সরকার সংস্থাকে অবশ্যই সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতির বাইরে রাখতে হবে।

মন্তব্য পড়ুন 0