রাজনৈতিক ‘প্রশ্রয়’ বন্ধ করতে হবে

দালালদের খপ্পরে হাসপাতাল

বিজ্ঞাপন

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল যেন এক মগের মুল্লুকে পরিণত হয়েছে। সংঘবদ্ধ দালালদের দৌরাত্ম্যের কাছে হাসপাতালটির কর্তৃপক্ষ কার্যত অসহায় দর্শকের মতো দেখছে দালালেরা ওষুধ বিক্রির প্রক্রিয়ায় কীভাবে রোগীদের গাঁট কাটছেন।

শনিবার প্রথম আলোর প্রথম পাতায় প্রকাশিত ‘ওষুধের স্লিপ টানাটানিতে সক্রিয় ৫৮ দালাল’ শিরোনামে বর্ণনা করা হয়েছে, দালাল ও ওষুধ বিক্রেতারা কীভাবে রোগীদের কাছে ওষুধ বিক্রি করে চার-পাঁচ গুণ বেশি দাম নিচ্ছেন। ৬০০ টাকা দামের ওষুধের বিনিময়ে এক রোগীর আত্মীয়ের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ২ হাজার ৬২০ টাকা—এমন একটি ঘটনার বিবরণ দেওয়া হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। রোগীদের জন্য চিকিৎসক ওষুধের ব্যবস্থাপত্র লিখে দেওয়ার পর ওয়ার্ড বয় কিংবা হাসপাতালের কোনো কর্মীর মাধ্যমে ওষুধের তালিকা হস্তগত করেন কোনো দালাল। রোগীর আত্মীয়রা দালালকে চিনতে পারেন না, তাঁকে হাসপাতালেরই কর্মী ভেবে তাঁর পিছু পিছু গিয়ে হাজির হন হাসপাতাল-সংলগ্ন কোনো ওষুধের দোকানে। সেই দোকানে বাজারমূল্যের চেয়ে চার-পাঁচ গুণ বেশি দাম নিয়ে রোগীর আত্মীয়কে ওষুধ দেওয়া হয়।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পূর্ব দিকের গেটে এ রকম প্রায় ২৫টি দোকান আছে। দালালেরা তাদের হয়েই রোগী ঠকানোর এ কাজে লিপ্ত রয়েছেন। দালালদের সহযোগিতা করেন হাসপাতালটির কর্মীদের একটি অংশ। অনেক সময় তাঁরা সহযোগিতা করতে বাধ্য হন। কারণ, দালালেরা নেহাত নিরীহ প্রকৃতির লোক নন; তাঁদের ‘খুঁটির জোর’ আছে। সেই জোরে তাঁরা রোগীদের ওষুধের তালিকা বা ‘স্লিপ’ ওয়ার্ড বয়দের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ওষুধের দোকানের দিকে হাঁটা শুরু করেন। রোগীদের নিরীহ-অনভিজ্ঞ আত্মীয়স্বজনেরা দালালটির পিছু পিছু ওষুধের দোকানে গিয়ে গাঁট কাটার শিকার হন।

প্রশ্ন হলো চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ রোগীদের ওপর দালালদের এ জুলুম কেন বরদাশত করে? তারা কি এ বিষয়ে অবগত নয়?

খুবই অবগত; কিন্তু অসহায়। অতীতে হাসপাতালটির বিভিন্ন পরিচালক দালাল চক্রকে উচ্ছেদের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। কারণ, দালালদের ‘খুঁটির জোর’ অত্যন্ত প্রবল। তাঁদের ‘প্রশ্রয়’ দেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজছাত্র সংসদের নেতারা। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন চমেক ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রিত ছাত্র সংসদের নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁরা দালালদের শক্তি জোগান। ফলে দালালদের ভয় পান হাসপাতালের নার্স, ওয়ার্ড বয়, এমনকি চিকিৎসকেরাও। দালালদের হাতে ওষুধের ব্যবস্থাপত্র না দিয়ে তাঁরা নালিশ করেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদের নেতাদের কাছে। নেতারা সে জন্য ওয়ার্ড বয়-নার্সদের ছাত্র সংসদ কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে হেনস্তা করেছেন—এমন দৃষ্টান্তও আছে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদ ও ছাত্রলীগের নেতারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন, কিন্তু তাতে দালাল চক্রের হাতে রোগীদের জুলুমের ঘটনাগুলো মিথ্যা হয়ে যায় না, তঁাদের পৃষ্ঠপোষকতার বিনিময়ে চাঁদার ভাগাভাগির অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতাও কমে না। বরং এগুলো চট্টগ্রামের মানুষের কাছে ‘ওপেন সিক্রেট’। হাসপাতালটির পরিচালক এস এম হুমায়ুন কবীর স্বয়ং দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘এই গ্রুপটার কারণে এখানে কিছু করা যাচ্ছে না। তারা বাধা হয়ে দাঁড়ায়।’

কিন্তু এ বাধা অবশ্যই দূর করতে হবে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে দালালমুক্ত করার কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য উচ্চতর রাজনৈতিক নেতৃত্বের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন