default-image

যেখানে অনেক মামলার নিষ্পত্তি হতে দশকের পর দশক লেগে যায়, সেখানে পাঁচ বছরের মাথায় জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন হত্যা মামলার রায় ঘোষণা একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবেই বিবেচিত হবে। গত বুধবার ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমান এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে আট আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এঁদের মধ্যে ছয়জন কারাগারে এবং ঘটনার মূল হোতা ও সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা সৈয়দ জিয়াউল হকসহ দুজন পলাতক।

মামলার অভিযোগপত্র ও আদালতের শুনানি থেকে হত্যাকাণ্ডের যে বিবরণ পাওয়া যায়, তা অত্যন্ত নৃশংস। আসামিরা নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম বা এবিটির সদস্য। পরবর্তী সময় এ সংগঠনের নাম হয় আনসার আল ইসলাম। সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল হকের নির্দেশে দীপনসহ বহু মানুষকে হত্যা করা হয়। মামলার একাধিক আসামি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানিয়েছেন কোথায় তাঁরা হত্যার পরিকল্পনা করছেন, কারা কীভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

আসামিদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি একুশের বইমেলা থেকে বের হওয়ার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বিশ্বাসের ভাইরাস বইয়ের লেখক অভিজিৎ রায়কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। হামলাকারীরা তাঁর স্ত্রীকেও মারাত্মক জখম করেন। পরে অভিজিৎ রায়ের বই প্রকাশের কারণেই প্রকাশক দীপনকে হত্যা করা হয়। বই প্রকাশের কারণে বাংলাদেশে কোনো প্রকাশককে খুনের ঘটনা এই প্রথম। বিচারকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, বই প্রকাশের কারণে মানুষ হত্যাকারীরা দেশ ও সমাজের শত্রু।

বাংলাদেশে জঙ্গি উত্থানের সূচনাপর্বে ধারণা করা গিয়েছিল, সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও স্বল্পশিক্ষিত তরুণেরা বিভ্রান্ত হয়ে জঙ্গিবাদে দীক্ষিত হচ্ছেন। কিন্তু দীপন হত্যায় দেখা গেল, একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্সের শিক্ষার্থীও এর সঙ্গে সরাসরি জড়িত। হোলি আর্টিজান হত্যাকাণ্ডে জড়িত তরুণদেরও বেশির ভাগ উচ্চশিক্ষিত।

জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সরকারের শূন্য সহিষ্ণুতা ও অব্যাহত অভিযানে জঙ্গিদের তৎপরতা অনেকটাই কমে গেছে। তাই বলে এ বিষয়ে শিথিলতা দেখানোর কোনো সুযোগ নেই। জঙ্গিদের হাতে অনেক মানুষ খুন হলেও বিচার হয়েছে খুব কমই। কখনো তদন্তে দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক হত্যার বিচার হয়নি। আবার অনেক ঘটনায় বিচারিক আদালতে রায় হলেও এর বিরুদ্ধে আপিল ঝুলে আছে। ফলে এসব মামলা শেষ হয়েও শেষ হয়নি। কোনো মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বলা যায় না বিচার হয়েছে বা আসামিরা শাস্তি পেয়েছেন। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, দ্রুত আপিল নিষ্পত্তি করে দ্রুততম সময়ে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।

নিহত দীপনের বাবা অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় সমাজে শুভচিন্তার বিস্তার এবং জঙ্গি চিন্তাচেতনার মানুষকে উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে বিবেচনাবোধ জাগ্রত করার তাগিদ দিয়েছেন। ভিন্নমতের কারণে মানুষ খুন ও হিংসা ছড়ানো কোনো ধর্মই অনুমোদন করে না। জঙ্গিদের সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি ভবিষ্যতে যাতে কেউ ভুল পথে না চালিত হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান দিয়ে জঙ্গিবাদ নির্মূল করা যাবে না। যে অপদর্শন ও রাজনীতি মানুষকে জঙ্গিবাদে দীক্ষিত করে, সমাজে এর বিস্তার রুখতে হবে।

বিজ্ঞাপন
সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন