সরকারি কেনাকাটায় দুর্নীতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ৬ হাজার টাকার বালিশ, ২৭ লাখ টাকার পর্দা, ১৬ গুণ অতিরিক্ত দামে মেডিকেলের বইয়ের পরে এবার বিশ্বব্যাংকের ঋণপুষ্ট ৪ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্পে সরকারি কেনাকাটায় হরিলুটের অভিযোগ উঠেছে। অবশ্য অতিমারি করোনাকালেও মাস্ক-পিপিই ও ভেন্টিলেটরের মতো জরুরি স্বাস্থ্যসামগ্রী কেনায় দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।

এসবই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে জনপ্রশাসন দুর্নীতির মধ্যে তলিয়ে যাচ্ছে। একে উদ্ধারের পথ কী? সব ধরনের সরকারি কেনাকাটায় দুর্নীতি বন্ধে সরকার পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট এবং ই-টেন্ডারিংয়ের ব্যবস্থা করেছিল। জনগণকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল, এ ব্যবস্থার ফলে ধারাবাহিকভাবে চলে আসা সরকারি কেনাকাটায় অবনতিশীল পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে। কিন্তু এখন তো দেখা যাচ্ছে, সরকারি কেনাকাটায় বরং পুকুরচুরির ঘটনাই স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হতে চলেছে।

বিজ্ঞাপন

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বালিশ–কাণ্ডের ঘটনা উদ্‌ঘাটনের পরে প্রশাসনসহ গোটা দেশে একটা হইচই সৃষ্টি হয়েছিল। তখন পর্যন্ত জনমনে একটা ধারণা ছিল যে একটি বালিশ কেনায় ৬ হাজার টাকা খরচ কাগজে-কলমে দেখানোর মতো বল্গাহীন দুর্নীতি নিশ্চয় বিচ্ছিন্ন ঘটনা। অবশ্য তখন অনেকের টনক নড়েছিল। কারণ, এটা অনুমান করা সংগত যে জনপ্রশাসনে যত বড় দুর্নীতি হয়, সেগুলোর সামান্যই গণমাধ্যমে আসে। নির্বাহী বিভাগের বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং তা নিয়ন্ত্রণের জন্য যেসব রক্ষাকবচ রয়েছে, সেগুলো মনে হচ্ছে একদম কাজ করছে না।

অনিয়ম সংঘটনে একশ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠছেন যে সাধারণ মানবিক ভয়-ডরও উধাও হতে চলছে। সাক্ষ্যপ্রমাণ রেখেই তাঁরা এখন দুর্নীতি করছেন। কারণ, তাঁরা জানেন, প্রচলিত ব্যবস্থায় তাঁদের কার্যকর শাস্তি দেওয়া মোটেই সহজ নয়; বরং একপ্রকার অসম্ভব। সে কারণে কেনাকাটা কেবল নয়, যেখানেই সরকারি অর্থসম্পদ রয়েছে, সেখানেই এর অপব্যবহার বা আত্মসাতের ঘটনা বাড়ছে।

বিজ্ঞাপন

দুর্নীতি আগেও ছিল, এখন তো সীমার বাইরে চলে যাচ্ছে। লুটপাটের মানসিকতা কতটা বেপরোয়া না হলে কেউ গরু-ছাগলের উন্নয়ন প্রকল্পে ৪৫ হাজার টাকার চেয়ারের দাম ৬ লাখ টাকা দেখাতে পারে? গাভির গর্ভবতী হওয়ার পরীক্ষার জন্য বাজারে ১ হাজার পিস বাক্সের কিটের দাম যেখানে বড়জোর ৫ হাজার টাকা, সেখানে তা দেখানো হয়েছে প্রায় ৫০০ গুণ বেশি। এই দামে কেনার প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে এবং কেনার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। এমন প্রস্তাব অনুমোদিত হয় কীভাবে?

এই অবিশ্বাস্য বাস্তবতা অবস্থা বোঝাতে এখন যেন আর ‘হরিলুট’, ‘পুকুরচুরি’, ‘সাগরচুরি’ কিংবা ‘ওলট-পালট করে দে মা লুটেপুটে খাই’—এমন সব প্রবাদ-প্রবচন আর যথেষ্ট বলে গণ্য হচ্ছে না। তাই জনমনে হতাশাসূচক প্রশ্ন; আমরা কোথায় যাচ্ছি।

বিজ্ঞাপন

এ হতাশার যৌক্তিক কারণ রয়েছে। কারণ, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে নির্বাহী বিভাগের সংবেদনশীলতা গুরুতর প্রশ্নবিদ্ধ। সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে উচ্চ আদালতকে হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে। কিন্তু তাতেও যে দোষীদের দ্রুত বিচার করা সম্ভব হচ্ছে, তা–ও নয়। বালিশ–কাণ্ডের ঘটনা তদন্তে দুটি উচ্চপর্যায়ের কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে সাবেক গণপূর্তমন্ত্রী (বর্তমানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী) জানিয়েছিলেন, ৩৪ জন কর্মকর্তা বা ব্যক্তি এর সঙ্গে জড়িত। এরপর ‘যথেষ্ট অগ্রগতি’ থাকলেও অপ্রিয় সত্যটা হলো, বালিশ–কাণ্ডের কেউ প্রাথমিকভাবেও এখন পর্যন্ত দণ্ডিত হননি।

সুতরাং আশঙ্কা করা যায়, বালিশ–সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী দুর্বৃত্তরা যেদিন আপিল বিভাগ থেকে প্রত্যাশিত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পাবে, তত দিনে বালিশ–কাণ্ডের মতো ঘটনা হয়তো গা–সওয়া ব্যাপারে পরিণত হবে। সুতরাং এদের রুখতে হলে তাড়াতাড়ি শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

মন্তব্য পড়ুন 0