সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের গচ্ছিত অর্থ ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়া কিংবা ক্ষমতা, কোনোটাই আমাদের নেই।’ কিন্তু এরপরও কেন অসম্ভব এ সিদ্ধান্ত নিতে গেল সরকার? সে প্রশ্নের ব্যাখ্যায় ‘চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনি’ প্রবাদবাক্যের শরণাপন্ন হয়ে পাচারকারীদের সুমতি ফেরার ওপর বিষয়টি ছেড়ে দিয়েছেন মন্ত্রী। এর অর্থ পরিষ্কার, সরকার নিজেই জানে, পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফেরত আনা অসম্ভব এক আশা। পরিকল্পনামন্ত্রী বরং দেশ থেকে অর্থ যাতে পাচার না হয়, সেদিকেই মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

সুইস ব্যাংকসহ বিদেশে প্রতিবছর কত টাকা ও কীভাবে তা পাচার হচ্ছে, এর কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে নেই। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) তথ্য অনুযায়ী, বাণিজ্যের নামে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর প্রায় ৬৪ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়। সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই দশকের মধ্যে গত বছরই (২০২১) বাংলাদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে সর্বোচ্চ অর্থ জমা হয়েছে।

যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক নানা সময়ে বলে এসেছে, সুইস ব্যাংকসহ বিভিন্ন দেশে যে অর্থ গেছে, তা বাংলাদেশ থেকে যায়নি। তবে ১৮ জুন এক সেমিনারে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) জানিয়েছে, বিভিন্ন সময়ে সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের কাছ থেকে বাংলাদেশের ৬৭ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অর্থ পাচারের তথ্য পেয়েছে তারা। মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসী অর্থায়ন প্রতিরোধে গঠিত সংস্থাটিও মনে করে, পাচার হওয়া টাকা উদ্ধার অনেক জটিল প্রক্রিয়া।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে কালোটাকার মালিকদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া শুরু হয় ১৯৭৬ সাল থেকে। কিন্তু গত কয়েক দশকে তাতে সাড়া মিলেছে সামান্যই। এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে ৭ শতাংশ করের মাধ্যমে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার যে সুযোগ রাখা হয়েছে, তার মাধ্যমে কালোটাকা সাদা করার নতুন অধ্যায়ে দেশ প্রবেশ করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

অনেকে মনে করছেন, এটা পাচারকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা না করে উল্টো বৈধতা দেওয়া হচ্ছে। এ সুযোগ নীতিবিরুদ্ধ ও অসাংবিধানিক বলেও কড়া সমালোচনা করেছেন কেউ কেউ।

পাচার হওয়া অর্থ ফেরতের সুবিধা নিয়ে যখন এত প্রশ্ন-সমালোচনা, সরকারের মধ্যেই যখন এত সংশয়, তখন এর যৌক্তিকতা কতটুকু? মূল সংকট হলো, নানা গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে বাজেটে রাজস্ব আয় বাড়ানো যাচ্ছে না। সে জন্যই এই ‘অলীক কল্পনা’র আশ্রয়। বাজেটে আয়-ব্যয়ের ঘাটতি পূরণে রাজস্ব বৃদ্ধির বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার অসম্ভব আশা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। বরং পাচার বন্ধ যাতে করা যায়, সেদিকেই মনোযোগ দিন।

সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন