নিরাপদ সড়ক

সম্পাদকীয়

সড়কপথের নিরাপত্তা, দুর্ঘটনা রোধ ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে ২০১৯ সালের ২০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে যে সড়ক পরিবহন আইন পাস হয়েছিল, সেটি সব মহলে প্রশংসিত হয়েছিল। দেশের পরিবহন খাত দীর্ঘদিন ধরে ১৯৩৯ সালের ‘বেঙ্গল মোটর ভেহিকেল অ্যাক্ট’ এবং ১৯৮৩ সালে মোটরযান অধ্যাদেশের মাধ্যমে পরিচালিত হতো।

২০১০ সালে সড়ক আইনের কার্যক্রম শুরু হলেও চূড়ান্ত হয় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে। উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের ২৯ জুলাই বিমানবন্দর সড়কে বেপরোয়া বাসের চাপায় দুই কলেজশিক্ষার্থী নিহত হলে সারা দেশের শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন করে। এরপর সড়ক দুর্ঘটনায় ব্যক্তির মৃত্যুর দায়ে পাঁচ বছরের সাজার বিধান রেখে সংসদে আইন পাস হয়।

কিন্তু পরিবহনমালিক সমিতি ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর বিরোধিতার কারণে গত দুই বছরেও আইনটি কার্যকর হতে পারেনি। এ আইন বাতিলের দাবিতে পরিবহনমালিক ও শ্রমিকেরা যৌথভাবে ধর্মঘট পালন করেন, যা ইতিহাসে বিরল। শ্রমিক ও মালিকের স্বার্থ কখনো এক হয় না। একপর্যায়ে সরকার আইনটির কার্যকারিতা স্থগিত রেখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের নেতৃত্বে একটি পর্যালোচনা কমিটি করে।

গত বৃহস্পতিবার প্রথম আলোর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কমিটি আইনের কতিপয় ধারা সংশোধনের সুপারিশ করেছে; যাতে দুর্ঘটনার দায়ে পরিবহনমালিক ও চালকদের শাস্তি আরও কমানো হয়েছে। বর্তমান আইনের ৮৪, ৯৮ ও ১০৫ ধারা ছিল অজামিনযোগ্য অপরাধ। পর্যালোচনা কমিটি ৮৪ ও ৯৮ ধারার অপরাধ জামিনযোগ্য করার সুপারিশ করেছে। এ ছাড়া ৯৮ ধারার অপরাধকে আপসযোগ্য করার কথা বলা হয়েছে। ১০৫ ধারায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির দায়ে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। সংশোধনে সুপারিশে কারাদণ্ড পাঁচ বছর রেখে জরিমানা কমিয়ে তিন লাখ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

৯৮ ধারায় নির্ধারিত গতির অতিরিক্ত গতিতে যানবাহন চালালে, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং বা ওভারলোডিংয়ের কারণে দুর্ঘটনা হলে চালক, কন্ডাক্টর বা সহকারীর তিন বছরের কারাদণ্ড কিংবা তিন লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। নতুন প্রস্তাবে ওভারলোডিং শব্দটি বাদ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত গতি শব্দের পরিবর্তে দ্রুত চালনা শব্দ যুক্ত করা হয়েছে। ওভারলোডিং শব্দ বাদ দেওয়ায় চালককে ধরা কঠিন হবে। দ্রুত চালনা কথাটিও অস্পষ্ট।

পরিসংখ্যান বলছে, মাত্র ১০ শতাংশ দুর্ঘটনার বিচার হয়। ৯০ শতাংশ অভিযুক্ত দায়মুক্তি পেয়ে যান। আইনটি শিথিল হলে দায়মুক্তির সংখ্যা শতভাগে উন্নীত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। যেখানে ‘কঠোর আইন’ থাকা সত্ত্বেও সড়কে হরহামেশা প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে, সেখানে শিথিল করলে যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাবে এবং সড়কে প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়বে, তাতে সন্দেহ নেই। যে আইন প্রায় ১০ বছর আলোচনার পর জাতীয় সংসদে পাস করা হয়েছে, সে আইন সংশোধনের প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না।

সর্বমহলে প্রশংসিত আইন সংশোধন করা হলে পরিবহনমালিক ও শ্রমিকেরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবেন। সড়কপথে যাত্রী সাধারণের চলাচল হবে আরও ঝুঁকিপূর্ণ। স্বার্থান্বেষী মহলের কাছে নতিস্বীকার না করে সড়ক পরিবহন আইনটি অবিকল বাস্তবায়ন করা হোক।