default-image

যে দেশে কিশোরীদের ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর খুন করার মতো নৃশংস ফৌজদারি অপরাধের মাত্রা উদ্বেগজনকভাবে বেশি, সে দেশে তাদের যৌন হয়রানি ‘লঘু অপরাধ’ হিসেবে উপেক্ষিত থেকে যাবে—এটা সাধারণ জ্ঞানেই অনুমেয়। সহিংস আচরণের বাড়াবাড়ি এবং তার আইনি প্রতিকারের অভাবের ফলে সমাজের স্বাভাবিক সংবেদনশীলতা কমে যায়, তখন আর হয়রানিকে সহিংস আচরণ বলে মনে না-ও হতে পারে। সম্ভবত এভাবেই কিশোরীদের যৌন হয়রানির ঘটনাগুলো অনালোচিত থেকে যায়। ‘খবর’ হিসেবে সেগুলো সংবাদমাধ্যমে জায়গা পায় না; পেলেও সমাজে তেমন চাঞ্চল্য জাগে না। বাংলাদেশে বাস্তবে সেটাই প্রতীয়মান হচ্ছে।

কিন্তু এ দেশে কিশোরীদের যৌন হয়রানি একটি বড় এবং গুরুতর সমস্যা। বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান (নিপোর্ট) এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) যৌথভাবে সারা দেশে পরিচালিত এক গবেষণা সমীক্ষার ফলাফল সম্প্রতি প্রকাশ করেছে, যেখানে কিশোরীদের যৌন হয়রানিকে ভায়োলেন্স বা সহিংস আচরণ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে এবং কিশোর বয়সী ছেলেমেয়েদের প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধের লক্ষ্যে পরিচালিত কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছে। ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী প্রায় পাঁচ হাজার বিবাহিত এবং প্রায় আট হাজার অবিবাহিত কিশোরীর মধ্যে সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, বিবাহিত কিশোরীদের ১৭ শতাংশ আর অবিবাহিত কিশোরীদের ৩৪ শতাংশ বছরে কমপক্ষে একবার যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, বিবাহিত কিশোরীদের তুলনায় অবিবাহিত কিশোরীদের মধ্যে যৌন হয়রানির হার দ্বিগুণ। এর একটা ব্যাখ্যা হতে পারে এমন যে কিশোরীদের বিয়ে হলে তাদের যৌন হয়রানির ঝুঁকি কমে যায়। এ বাস্তবতার ক্ষতিকর সামাজিক দিকটি হলো এর ফলে কিশোরীদের বাল্যবিবাহের শিকার হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। অভিভাবকেরা এই ভেবে মেয়েদের বিয়ের বয়স হওয়ার আগেই বিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চান যে এভাবে মেয়ের নিরাপত্তা বাড়বে। জরিপটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে কিশোরীদের যৌন হয়রানির ঘটনা বেশি ঘটে রাস্তাঘাটে। এর অর্থ হলো গৃহের বাইরে গেলেই তাদের নিরাপত্তা কমে যায়, যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়, যা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পুলিশ বাহিনীর। কিন্তু আমাদের পুলিশ বাহিনীকে যখন খুন-ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধগুলো দমনেই হিমশিম খেতে হয়, তখন রাস্তাঘাটে কিশোরীদের যৌন হয়রানি রোধের দিকে দৃষ্টি দেওয়ার অবকাশ কোথায়।

‘বাংলাদেশে কৈশোর স্বাস্থ্য ও সুস্থতা জরিপ, ২০১৯-২০’ শিরোনামের উল্লিখিত সমীক্ষা প্রতিবেদনটিতে কিশোরীদের যৌন হয়রানিকে তাদের স্বাস্থ্য ও সুস্থতার (হেলথ অ্যান্ড অয়েলবিয়িং) অন্তর্গত একটি সমস্যা হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে। কারণ, যৌন হয়রানি এমন এক ক্ষতিকর অভিজ্ঞতা, যা কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘস্থায়ী ও সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর ফলে সে ট্রমা বা মানসিক আঘাতের শিকার হতে পারে, তার মধ্যে ভীতিবাতিকগ্রস্ততা ও বিষাদগ্রস্ততা, বিচ্ছিন্নতা, নিজের প্রতি অযৌক্তিক ঘৃণাবোধ, অপরাধবোধ ইত্যাদি ক্ষতিকর মনোভঙ্গি সৃষ্টি হতে পারে। এসবের ফলে তার পড়াশোনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত বাল্যবিবাহের শিকার হওয়ার ঝুঁকি দেখা দিতে পারে।

সুতরাং এ সমস্যাকে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। ধর্ষণসহ অন্যান্য সহিংস আচরণের প্রতিকারের লক্ষ্যে যেসব পদক্ষেপ ও
কর্মসূচির পরিকল্পনা করা হয়, কিশোরীদের যৌন হয়রানিকেও তার অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।

সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন