প্রথম আলোর জন্মদিনে একটি চাওয়া

শিউলি ফুল, শিউলি ফুল, কেমন ভুল, এমন ভুল। রাতের রায় কোন মাথায় আনিল হায় বনছায়ায়, ভোরবেলায় বারে বারেই ফিরিবারে হলি ব্যাকুল\ হেমন্তের হিমেভেজা শিশিরঝরা সকালটা আজ একেবারে মেঘলা। সূর্য বাবাজি সকাল থেকেই পলাতক। বিছানা ছাড়তে ছাড়তে আটটা (অ্যানালগ হিসেবে ঠিকই আছে যদিও)। উত্তরের ঝুল বারান্দায় দাঁড়িয়ে আবহাওয়ার গুমোট ভাবটা আন্দাজ করতে পারলাম। কিডস টিউটরিয়ালের বাচ্চাগুলো এর মধ্যেই কলকাকলিতে মুখরিত করে ফেলেছে আশপাশটা। টিয়ার ঝাঁকটা প্যাঁচ প্যাঁচ রব তুলে জানান দিল তাদের অবস্থান, কদমগাছটায়। কিছুদিন আগে ফোটা কিছু কদম ফুলের অবশিষ্ট গুটিগুলো খুঁজে ফিরছে তারা ডালে ডালে। সহজে ওদের দেখা যায় না পাতার রঙে মিলে যাওয়ায়। প্যাঁক শব্দই চোখকে নিয়ে যায় ওদের উদ্দেশে।হঠাত্ই শিশুদের কলকাকলি ছাপিয়ে বিভিন্ন যানবাহনের হর্ন আর রিকশার ঘণ্টিতে দূষিত হয়ে উঠল পরিবেশটা। তার ওপর চিত্কার-চেঁচামেচি। হঠাত্ই যানজট। যদিও রাস্তাটা একমুখী। তবুও সেই শান্তিনগর বাজারের কাছে কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির কাছ থেকে লাইন পড়ে গেছে গাড়ির। এক লাইন থেকে দুই লাইন, তার থেকে রিকশার আরেক লাইন, সবাই আগে যেতে চায়। কেউ কারও পেছনে দাঁড়াতে রাজি নয়। বিরক্ত হয়ে ঘরে ফিরে পত্রিকাটি নিয়ে বসলাম। ভালো লাগে না। এ যানজট সত্যিই আর ভালো লাগে না। জানি, কারোরই ভালো লাগার নয় এ দশা। পত্রিকার পাতা উল্টে দেখলাম বাংলাদেশে জাপানি রাষ্ট্রদূত তামোতসু শিনোতসুকারও বিরক্তির কারণ ঘটিয়েছে, এই ঢাকা শহরের যানজট। এবং তিনি যথার্থই বলেছেন, যানজট নিরসনে পাতালপথ আর উড়ালসেতুই যথেষ্ট নয়। নয়ই তো। জিজ্ঞেস করতে পারেন এত নিশ্চিত করে কেন ‘নয়’ বললাম। আমাদের যানজটের প্রধান কারণ ভাবুন একবার:১. যানবাহনের চালক এবং পথচারীদের নিয়ম না মানার প্রবণতা। ফলে বিশৃঙ্খলা। ২. এই বিশৃঙ্খলা নিরসনে ট্রাফিক পুলিশের ব্যর্থতা। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ তাঁরা অদ্যাবধি পথচারীদের ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে এবং ওভারব্রিজ দিয়ে রাস্তা পার হতে বাধ্য করতে সক্ষম হননি। ৩. আজ পর্যন্ত ট্রাফিক বিভাগ কোনো কার্যকর যান চলাচল পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে পারেনি। অথচ যথাযথভাবে যানবাহন চলাচলের প্রাথমিক পদক্ষেপই হচ্ছে সুচিন্তিত পরিকল্পনা। থাইল্যান্ডের কথা আমরা সবাই জানি। এ দেশটা একসময় যানজটের যন্ত্রণায় কাতর ছিল। সেই তিরানব্বই সালের আমার নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলি। জাপানে একটা শো করে ফেরার পথে আমার আর বিপাশার ব্যাংককে আমার বাল্যবন্ধু রাজীউল হাসানের বাসায় অতিথি হওয়ার সুযোগ হয়েছিল। রাজীউল তখন সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাসের অন্যতম ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। সকালে যখন ওকে অনুরোধ করলাম অফিস যাওয়ার পথে আমাদের রবিনসন সুপার স্টোরে নামিয়ে দিতে, সে হেসে বলেছিল, ‘নামিয়ে দিতে কোনো অসুবিধা নেই। তার আগে একটা গল্প বলি, শোনো। ব্যাংককের রাস্তায় এক লোক গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় দেখে তার এক বন্ধু ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। গাড়ি থামিয়ে বন্ধুকে সৌজন্য দেখিয়ে লিফট অফার করতেই বন্ধু বলে, সরি দোস্ত, আমার একটু তাড়া আছে, আমি হেঁটেই যাই।’ ঢাকার বর্তমান অবস্থা, আমার ধারণা, এখন এর চেয়েও খারাপ। তবে পার্থক্য আছে অবশ্যই। এখানে পত্রিকায় যানজটের খবরে বিরক্ত হয়ে মাননীয় মন্ত্রী যানজট খুঁজতে কাঁচপুর সেতু পর্যন্ত ধাওয়া করেও ব্যাঙের সুরে বলেন, ‘কোথায় যানজট?’ আর ওখানে তখন স্বয়ং রাজা যানজটে তিক্ত-বিরক্ত হয়ে একেবারে ব্যক্তিগত তহবিল থেকে মিলিয়ন মিলিয়ন বাথ বের করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘এই নাও টাকা, আমি কিছু বুঝি না, যানজট থামাও।’ থেমেছে। আজ এতগুলো বছরে থাইল্যান্ড যানজট নিয়ন্ত্রণে ল্যান্ডমার্ক সৃষ্টি করতে পেরেছে। গোটা বিশ্বের কাছে এটা একটা উদাহরণ হয়ে গেছে আজ। তারা বোধহয় জাপানের সাহায্য-সহযোগিতা পেয়েছিল (আমার ধারণা)। সেই জাপানেরই রাষ্ট্রদূতের যে মন্তব্য দেখলাম আজ পত্রিকায়, সেটাকে যথাযথ মূল্য দেওয়া প্রয়োজন। কারণ, পাতালপথ আর উড়ালসেতুর মতো অবকাঠামো নির্মাণের জন্য যে সময় প্রয়োজন (অর্থের অভাব কখনোই হয় না) সে সময়টুকুতে কী হবে আমাদের? বিস্ময়কর কিছু ঘটার অপেক্ষায় থাকব? ওয়েট ফর গডো?নাহ। যানজটের কথা লিখতে গিয়েই মাথা ভারী হয়ে গেছে। পথে নামলে কী হয় সে তো আপনারা সবাই জানেন। এই কাল দুপুরে উত্তরার সাত নম্বর সেক্টরের পার্কের পাশে যানজটে প্রায় ঘণ্টাখানেক ব্যয় করতে হলো। এই পথগুলোতে (যেসব রাস্তায় স্কুলের আধিক্য) যানজট সমাধানের একমাত্র উপায় একমুখী চলাচলের ব্যবস্থা করা। এটা কে বোঝাবে ট্রাফিক দেবতাদের! আর যে বোঝাতে পারুক, আমি যে পারব না এটা নিশ্চিত। সুতরাং আসুন, ছোট একটা গল্প বলে শেষ করি আজকের কড়চা। ট্রাফিক পুলিশের গাড়ি তাড়া করছে একটি গাড়িকে। যত তাড়া খাচ্ছে, গাড়িটির গতি বৃদ্ধি পাচ্ছে ততই। এ-পথ, ও-পথ, এ-গলি, ও-গলি করে অনেক সময় ব্যয় করে শেষ পর্যন্ত পুলিশ সার্জেন্ট গাড়িটিকে আটকাতে সমর্থ হন একটি কানাগলিতে এসে। সার্জেন্ট লাফ দিয়ে গাড়ি থেকে নেমে গিয়ে ধাবমান গাড়ির ড্রাইভারকে নামিয়ে জানতে চান, ‘কী ব্যাপার আপনার, সেই কখন থেকে আপনাকে থামতে ইঙ্গিত করছি। আর আপনি গতি বাড়িয়ে যাচ্ছেন, সমস্যাটা কী?’ ‘মাফ করবেন স্যার, গত সপ্তাহে আমার স্ত্রী একজন ট্রাফিক সার্জেন্টের সঙ্গে পালিয়েছে। আমি ভেবেছিলাম তিনি বুঝি আবার আমার স্ত্রীকে ফেরত দিতে আসছেন। সেই ভয়েই পালাচ্ছিলাম স্যার।’আমার তো মনে হয়, বাংলাদেশের সব গাড়ির ড্রাইভারেরই এই কেস। প্রথম আলো কি দ্বাদশ বছরটি যানবাহন ও পথচারী চলাচলে জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য ব্যয় করবে, প্রতিদিন শেষের পাতায় কিছুটা জায়গা দিয়ে, যাতে সারা জাতি এই কেস-মুক্ত হতে পারে! শুভেচ্ছা।৫ নভেম্বর ২০০৯আবুল হায়াত: নাট্যব্যক্তিত্ব।