default-image

১৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় মাদারীপুরের কালকিনি পৌরসভা নির্বাচনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মসিউর রহমান নির্বাচন কমিশনের কাছে মৌখিকভাবে অভিযোগ করেছেন, মাদারীপুরের পুলিশ সুপার নিজের গাড়িতে করে তাঁকে কালকিনি থেকে ঢাকায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন; সেখানে তাঁকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে ‘অনুরোধ’ করা হয়েছিল। জাতীয় সংবাদমাধ্যমে এ ঘটনার যে বিবরণ ছাপা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এমন আচরণ কোনোভাবেই প্রত্যাশিত হতে পারে না।

কালকিনি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গত শনিবার বিকেলে মসিউর রহমানকে ডেকে নিয়ে নিজের গাড়িতে তোলেন, তারপর তাঁকে নিয়ে যান জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে। তারপর থেকে মসিউর রহমানের পরিবার–পরিজন ও সমর্থকেরা তাঁর কোনো খোঁজ পাচ্ছিলেন না। তাঁর উদ্বিগ্ন ও ক্ষুব্ধ সমর্থকেরা একপর্যায়ে কালকিনি থানা ঘেরাও করেছিলেন। মসিউর রহমান দৃশ্যত ‘নিখোঁজ’ হওয়ার ১১ ঘণ্টা পর রোববার রাত পৌনে চারটায় নিজের বাড়িতে ফেরেন। এই ১১ ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে ঢাকার ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে নিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে বলা হয়। মসিউর রহমানের অভিযোগ অস্বীকার করে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহবুব হাসান বলেন, মসিউর রহমান ব্যক্তিগত কাজে ঢাকা গিয়েছিলেন, তিনি তাঁকে সহায়তা করেছেন। তাঁর ঢাকা যাওয়ার কারণ এসপি সাহেবের জানা নেই বলে তিনি দাবি করেন।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানে এসপির এ বক্তব্য বিশ্বাসযোগ্য নয়; বরং মসিউর রহমানকে প্রায় অপহরণের কায়দায় তুলে নিয়ে গিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল—এ ভাষ্যই বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। কালকিনি থানার একাধিক পুলিশ সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় সাংবাদিকদের তেমন ধারণাই দিয়েছেন। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য স্থানীয় পুলিশ কর্তৃপক্ষের এমন আইনবহির্ভূত আচরণ উদ্বেগজনক ও নিন্দনীয়। মসিউর রহমান ও তাঁর স্বজনদের মানসিক অবস্থা বিবেচনা করলে উদ্বেগটা অনুভব করা যায়। জনগণের নিরাপত্তার জন্য নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এমন সংঘবদ্ধ অপরাধীসুলভ আচরণ চূড়ান্ত বিচারে এ বাহিনীর পক্ষেই ক্ষতিকর। এভাবে তাদের ওপর জনগণের আস্থা আরও কমে যেতে বাধ্য। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতাদের অবশ্যই এটা স্মরণে রাখা উচিত যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা অন্যায়; এমন অগ্রহণযোগ্য পন্থায় রাজনৈতিকভাবে লাভবান হওয়াও সম্ভব নয়।

‘অপহৃত অবস্থা’ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার পরও মসিউর রহমানের ওপর নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য চাপ অব্যাহত রয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। মসিউর রহমান স্থানীয় নির্বাচনী কর্তৃপক্ষকে মৌখিকভাবে জানিয়েছেন, কিন্তু রিটার্নিং কর্মকর্তার বক্তব্য হলো মসিউর রহমান পুলিশ সুপারের বিরুদ্ধে লিখিতভাবে অভিযোগ করলে তাঁরা নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী পদক্ষেপ নেবেন। কিন্তু মসিউর রহমান না নির্বাচন কমিশনে, না থানায় লিখিতভাবে কোনো অভিযোগ পেশ করেছেন। তাঁর মানসিক অবস্থা দুর্বোধ্য নয়; এখন তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করা একান্ত জরুরি। সেটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরই দায়িত্ব। সে দায়িত্ব অবশ্যই তাদের পালন করতে হবে। আর দেশের কোনো অঞ্চলে কোনো ব্যক্তির সঙ্গে এমন সন্ত্রাসমূলক বেআইনি আচরণের পুনরাবৃত্তি কাম্য নয়।

বাংলাদেশে স্থানীয় ও জাতীয় সব পর্যায়ে নির্বাচন ব্যবস্থার যে ক্ষতিসাধন ইতিমধ্যে করা হয়েছে, তা–ই যথেষ্ট। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের এখন থামা উচিত। আসন্ন কালকিনি পৌরসভা নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী মসিউর রহমানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তাঁকে অবাধে ও নির্ভয়ে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নিতে দেওয়া হোক।

সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন