তিতাস গ্যাস থেকে যাঁরা ইতিমধ্যে প্রিপেইড মিটার পেয়েছেন, তাঁরা নিঃসন্দেহে ভাগ্যবান। কিন্তু ৩৮ লাখের মধ্যে মাত্র দুই লাখ গ্রাহক এ সুবিধা পাচ্ছেন। বাকিরা মিটারের সুবিধা থেকে বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) দাম নির্ধারণকালে আবাসিকে দুই চুলার একজন গ্রাহক মাসে সর্বোচ্চ ৭৭ ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহার করতে পারেন বলে ধরে নেয়। এ হিসাবে দাম ধরা হয়েছে ৯৭৫ টাকা। অথচ একজন গ্রাহক মাসে গড়ে ৪৫ থেকে ৫০ ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহার করেন, যার দাম ৫৭০ থেকে ৬৩০ টাকা। গ্রাহক যদি মাসে গড়ে ৩৩ ঘনমিটার গ্যাস কম ব্যবহার করেন, তাহলে তাঁর বাড়তি বিল দিতে হয় ৪১৬ টাকা। সেই হিসাবে ছয়টি কোম্পানির ৩৬ লাখ গ্রাহককে বছরে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বাড়তি বিল দিতে হচ্ছে। প্রিপেইড মিটার না থাকার সুযোগে তিতাস কোম্পানি গ্রাহকদের কাছ থেকে এ বাড়তি অর্থ আদায় করছে।

বাসাবাড়িতে গ্যাস সরবরাহে শৃঙ্খলা ও সমতা আনতে জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) সহায়তায় সরকার ২০১৫ সালে ঢাকায় দুই লাখ গ্রাহকের বাসায় প্রিপেইড মিটার বসানোর পরিকল্পনা করে। প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে লেগেছে পাঁচ বছর। নতুন করে তারা ১ লাখ ২০ হাজার মিটার স্থাপনের প্রকল্প নিয়েছে, যা ২০২২ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। সে ক্ষেত্রে ৩৪ লাখ ৮০ হাজার গ্রাহক এ সুবিধার বাইরে থেকে যাবেন। গ্যাসের প্রিপেইড মিটার বসানোর কাজ কি এতই কঠিন যে এটি করতে কয়েক দশক লেগে যাবে?

বিজ্ঞাপন

তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ যে গ্রাহকদের কম গ্যাস দিয়ে বেশি বিল নিয়ে যাচ্ছে, সেটি কোথায় যাচ্ছে? রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যাচ্ছে না। এই গ্যাস বাসাবাড়ি বা কারখানায় অবৈধ সংযোগ দিয়ে কোটি কোটি টাকা ‘ফাও’ কামিয়ে নিচ্ছেন তিতাসের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারী। সব গ্রাহককে প্রিপেইড মিটার দিলে সেটি সম্ভব হবে না। এ কারণেই তঁাদের প্রিপেইড মিটার প্রকল্প চলছে শম্বুকগতিতে। ঢাকা ও আশপাশের চার জেলায় গ্যাসের প্রায় ২৪৫ কিলোমিটার অবৈধ পাইপলাইন রয়েছে। যখন লেখালেখি হয়, তাঁরা কিছু অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। কিছুদিন পর সেগুলো অলৌকিকভাবে পুনঃসংযুক্ত হয়ে যায়।

এ অবস্থা থেকে দ্রুত উত্তরণ প্রয়োজন। ২০২২ সালের মধ্যে সব গ্রাহক বাসাবাড়িতে যাতে প্রিপেইড মিটার পান, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে গ্রাহকদের কাছ থেকে মিটারের দাম নেওয়া হোক। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রিপেইড মিটার থাকলে ৪০ শতাংশ গ্যাস কম পুড়ত, গ্রাহকেরা মিতব্যয়ী হতেন। দেশ এখন দুদিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রথমত, অপ্রয়োজনে বেশি গ্যাস পোড়ানো। দ্বিতীয়ত, অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে গ্যাস চুরি। রাষ্ট্রীয় সব সেবা খাতেই যথেচ্ছ অপচয় ও চুরি হয়ে থাকে। এ ব্যাপারে সরকারের নীতিনির্ধারকেরা মুখে যত কঠোরতার কথা বলুন না কেন, কাজে তার বিপরীতটাই হয়ে আসছে।

অভিযোগ আছে, এলপিজি ব্যবসায়ীদের সুবিধা করে দিতেই সরকার বাসাবাড়িতে নতুন গ্যাস-সংযোগ বন্ধ রেখেছে। অভিযোগটি একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অনেক কম। সরকার চাইলে আমদানি করা গ্যাসও পাইপলাইনের মাধ্যমে বাসাবাড়িতে সরবরাহ করতে পারে। ভারতে আগে কেবল বাসাবাড়িতে এলপিজি ব্যবহার করা হতো। সম্প্রতি তারাও পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছে। সবার ওপরে গ্রাহকের স্বার্থ দেখতে হবে।

মন্তব্য পড়ুন 0