আবাসিক হলে এই জবরদখল কেবল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েই ঘটেছে, তা নয়। প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক শিক্ষার্থীরা এই অনাচারের শিকার। প্রথম আলোতে গত মঙ্গলবার তিনটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তাতে বিশ্ববিদ্যালয় বা হল প্রশাসনের অস্তিত্ব আছে বলে মনে হয় না। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেমন আবাসিক শিক্ষার্থী বেশি, সমস্যাও প্রকট। কোন কক্ষে কোন শিক্ষার্থী থাকবেন, সেটি ঠিক করে সরকার-সমর্থক ছাত্রসংগঠনটির নেতা-কর্মীরা। প্রায় সব হলে তাঁরা ‘গণরুম কালচার’ চালু করেছেন। এসব গণরুমের বাসিন্দাদের ছাত্রলীগের মিছিল-সমাবেশে উপস্থিত থাকা ও তালিম নেওয়া বাধ্যতামূলক। যাঁরাই ছাত্রলীগের হুকুম মানেন না, তাঁদের নির্যাতনের শিকার হতে হয়। গত জানুয়ারি মাসে বিজয় একাত্তর হলে ছাত্রলীগের নির্যাতনে একজন শিক্ষার্থী অচেতন হয়ে পড়েন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হলে থাকতে হলে ছাত্রলীগের কাছে ধরনা দিতে হয়। পাঁচ বছর ধরে হল প্রশাসন কক্ষ বরাদ্দ দেওয়া বন্ধ রেখেছে। ছাত্রলীগই বরাদ্দের কাজটি করে থাকে। অন্যদিকে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে হল প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে মাত্র ৪.৪১ শতাংশ আসন। ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রণ করে প্রায় ৭৯ শতাংশ। তবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যতিক্রমীভাবে অল্প কিছু আসন সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, ছাত্র ফেডারেশন ও তাবলিগও নিয়ন্ত্রণ করে বলে প্রথম আলোর খবরে উল্লেখ করা হয়।

এসব ঘটনা কী প্রমাণ করে? পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনের কোনো কর্তৃত্বই নেই। আবাসিক হলে সরকার-সমর্থক ছাত্রসংগঠনের জবরদখলের কারণে অনেক অঘটনও ঘটেছে, অনেক শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ও হল প্রশাসন এই জবরদস্তির বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। অনেক ক্ষেত্রে ছাত্রলীগ যা বলেছে, তারা সেটাই অবনত মস্তকে মেনে নিয়েছে।

পাবলিক বিশবিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে যখন এই নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খল অবস্থা চলছে, তখন প্রশাসন নির্বিকার। প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা সবকিছু ঠিক আছে বলে দায় এড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা চালাচ্ছেন। শিক্ষা, শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষার চেয়ে তাঁদের কাছে ছাত্রলীগের কৃপা লাভই অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এই অবিমৃশ্যকারিতার জন্য যে আমাদের শিক্ষার মান ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে। বিশ্বের সেরা ৮০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় না থাকার লজ্জাও তাঁদের স্পর্শ করছে না। এই লজ্জাহীন প্রশাসন যত দিন উচ্চশিক্ষার অভিভাবক হিসেবে থাকবে, তত দিনে দেশের শিক্ষার অবনতি ঠেকানোর কোনো পথ আছে বলে মনে হয় না।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোয় প্রশাসনের কর্তৃত্ব ফিরে আসুক, ছাত্রলীগের দৌরাত্ম্য বন্ধ হোক, সাধারণ শিক্ষার্থীরা মেধার ভিত্তিতে হলের আসন বরাদ্দ পাক—এটাই প্রত্যাশিত।

সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন